এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেছেন দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের দেশ সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার ভুসিচ। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এবং ব্যাপক জনঅসন্তোষের মধ্যে চলা আন্দোলনের পর তাঁর পদত্যাগে দেশটিতে আগাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পথ তৈরি হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী অক্টোবরে সার্বিয়ায় আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে চলতি বছরেই দেশটির জনগণকে দুই দফা ভোটের মুখোমুখি হতে হবে। প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিজের দল থেকে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হওয়ার কথা জানিয়েছেন ভুসিচ।
পদত্যাগের পর রাজধানী বেলগ্রেডে প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ভুসিচ বলেন, নয় বছর ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁর সরকার দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এর আগে গত জুনেই পদত্যাগের ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন ভুসিচ। আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিজের দল থেকে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হচ্ছেন তিনি। তবে সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই তাঁর।
রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ভুসিচের সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়মকানুন এড়িয়ে চলা ও অনিয়মের অভিযোগে ক্ষোভ ছিল। ২০২৪ সালে নোভি সাদ রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা সেই ক্ষোভকে বড় ধরনের বিক্ষোভে রূপ দেয়। পরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক থেকে শুরু করে শ্রমিক ও কৃষকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ওই দুর্ঘটনা ভুসিচের প্রগ্রেসিভ পার্টির এক দশকের বেশি সময়ের শাসনামলের বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র সামনে এনেছে। রেলস্টেশনটির সংস্কারকাজের সঙ্গে ভুসিচও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। সংস্কারের পর স্টেশনটিকে সার্বিয়ার অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
আন্দোলনের মুখে ভুসিচ সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি পদত্যাগ করলেও বিক্ষোভ থামেনি। পুরো গ্রীষ্মজুড়েই আন্দোলন চলতে থাকে। পরে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বিবিসি জানিয়েছে, সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভুসিচের বর্তমান মেয়াদ আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা ছিল। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পদ শূন্য হওয়ার পর সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হবে। ফলে চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই সার্বিয়ার জনগণকে দুইবার ভোট দিতে হতে পারে।
ভুসিচ জানিয়েছেন, আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি সময় পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অক্টোবরে আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। দীর্ঘদিনের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতেই এই নির্বাচন ডাকা হয়েছে। আন্দোলনকারীরাও তাদের দাবির মধ্যে নতুন নির্বাচনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
এর আগে ভুসিচ জানিয়েছিলেন, প্রগ্রেসিভ পার্টির নেতা হিসেবে তিনি ওই নির্বাচনে লড়বেন। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পরও দেশটির রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে সক্রিয় থাকার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
এদিকে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রগ্রেসিভ পার্টির সদস্য আনা ব্রনাবিচ।
সার্বিয়ার সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএস জানিয়েছে, সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ৪৯ জনকে ক্ষমা করেছেন ভুসিচ। তাদের মধ্যে ২৩ জন শিক্ষার্থী এবং তাঁর দলের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন রয়েছেন। গত দেড় বছরে দেশ যে ‘ভয়াবহ পরিস্থিতির’ মধ্য দিয়ে গেছে, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল।
আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভুসিচের প্রগ্রেসিভ পার্টির মুখোমুখি হবে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ‘স্টুডেন্টস উইন’ এবং পশ্চিমাপন্থি বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইউরোপিয়ান সার্বিয়া’।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সার্বিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন ভুসিচ। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।
ভুসিচ প্রকাশ্যে সার্বিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য করার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং চীনা বিনিয়োগের জন্য সার্বিয়ার অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করেছেন।
জ/উ