বছরের শুরু থেকে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা কমার স্থায়ী কোনো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। কোনো মাসে মোট ঘটনা কিছুটা কমলেও ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, হত্যা, আত্মহত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের মতো গুরুতর অপরাধ বেড়েছে বিভিন্ন সময়ে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাসিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এমন চিত্র উঠে এসেছে।
এমএসএফের হিসাবে, জানুয়ারিতে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ছিল ২৭১টি। ফেব্রæয়ারিতে তা বেড়ে ২৯৫, মার্চে ২৮৯, এপ্রিলে ৩১২, মে মাসে ৩২৬ এবং জুনে ৩৪৮টিতে দাঁড়ায়। জুলাইয়ে কিছুটা কমে ৩০৬ হলেও আগস্টে আবার বেড়ে হয় ৩২৭টি। অর্থাৎ আট মাসের মধ্যে জুনে সর্বোচ্চসংখ্যক ঘটনা নথিভুক্ত হয়।
বছরের প্রথম মাসেই ছিল উদ্বেগজনক চিত্র। জানুয়ারিতে ৪২টি ধর্ষণ, ১৫টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার দুটি ঘটনা ঘটে। একই সময়ে ৪৬ নারী ও শিশু আত্মহত্যা করেন এবং ৬২ জন হত্যার শিকার হন। ফেব্রæয়ারিতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১২টি এবং ধর্ষণের পর হত্যা পাঁচটি হিসেবে নথিভুক্ত হয়। এ মাসে নির্বাচনী সহিংসতাও ছিল উল্লেখযোগ্য।
মার্চে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে ৬৬টিতে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৪ জন নিহত ও ৬৪১ জন আহত হওয়ার তথ্যও দেয় এমএসএফ। এপ্রিলে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা বেড়ে ৩১২টি হয়। ওই মাসে ৫৪টি ধর্ষণ, ১৪টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ৮৯ নারী, কিশোরী ও শিশুর হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়। গণপিটুনিতে নিহত হন ২১ জন।
মে মাসে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়। নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা ৩২৬টিতে পৌঁছায়। ধর্ষণ ৭৮টি, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১৬টি এবং ধর্ষণের পর হত্যা ছয়টি। একই মাসে গণপিটুনিতে ৩২ জন নিহত ও ৭১ জন গুরুতর আহত হন।
জুনে মোট সহিংসতার ঘটনা আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৪৮টিতে ওঠে। ধর্ষণের শিকার হন ৭৬ জন; তাঁদের মধ্যে ৫১ জন কন্যাশিশু, ১৯ জন নারী ও ছয়জন ছেলে শিশু। জুলাইয়ে মোট ঘটনা ৩০৬টিতে নেমে এলেও ধর্ষণ বেড়ে ৯০টিতে দাঁড়ায়। আত্মহত্যাও ১৭ থেকে বেড়ে ২৮টি হয়। এ মাসে ১১টি পরিত্যক্ত নবজাতক বা শিশুকে উদ্ধারের তথ্য দেয় এমএসএফ; তাদের মধ্যে আটজন মারা যায়।
আগস্টে এক মাসেই বড় লাফ
আগস্টের চিত্র সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে। জুলাইয়ের ৩০৬টির তুলনায় নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা বেড়ে ৩২৭টি হয়েছে—বৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে গুরুতর অপরাধে বৃদ্ধির হার আরও বেশি। এমএসএফ বলছে, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বেড়েছে ৭২ শতাংশ, ধর্ষণ ও হত্যা ৬৭ শতাংশ, আত্মহত্যা ৩৯ শতাংশ, অপহরণ ও নিখোঁজ ৮ শতাংশ এবং বেআইনি সালিশ ৩৩ শতাংশ। নারী ও শিশু হত্যা ৫২টি থেকে বেড়ে ৯১টিতে পৌঁছেছে—বৃদ্ধি প্রায় ৭৫ শতাংশ।
আগস্টের কয়েকটি ঘটনা আইনের শাসন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। গাইবান্ধায় ধর্ষণের অভিযোগের পর ভুক্তভোগী নারীকে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে সাত লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নোয়াখালীতে ১১ বছরের শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগে সালিশে ৫০ বেত্রাঘাত ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং শরীয়তপুরে ১২ বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা এক লাখ টাকায় মীমাংসার অভিযোগ এসেছে।
এ ছাড়া আগস্টে তিনটি জীবিত নবজাতককে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে এমএসএফ। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব ঘটনায় প্রকৃত অভিভাবক বা দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ঘটনা খুবই বিরল।
অপরাধের পাশাপাশি বাড়ছে মাদক মামলা: আগস্টে মাদক মামলায় আটকও জুলাইয়ের তুলনায় ১২৯ শতাংশ বেড়েছে। অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত ঘটনায় একজন নিহত, একজন আহত এবং চারজন আটক হয়েছেন। লালমনিরহাটে অনলাইন জুয়ার প্রতিবাদ করায় এক শিক্ষক নিহত ও একজন আহত হওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আট মাসের এই পরিসংখ্যান বলছে, নারী ও শিশুর নিরাপত্তার সংকট কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধের বিষয় নয়। পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, হত্যা, মাদক, অনলাইন জুয়া, সামাজিক সালিশ এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত মামলা গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, বৈজ্ঞানিক আলামত সংগ্রহ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধকে সালিশে মীমাংসার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধের পেছনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা না নিলে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থামানো কঠিন হবে।
জ/বা