ভেনিসের একটি পার্কে পানি ও কোল্ড ড্রিংকস ছোড়া, শারীরিক ও মৌখিক হেনস্তার অভিযোগ-তারপর সেই ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে তীব্র ক্ষোভ। একের পর এক ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রে থাকা অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে ঘিরে বিতর্ক এবার পেয়েছে আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় মাত্রা। গত ৭ সেপ্টেম্বর ইতালির মেস্ত্রে শহরে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনার পরদিনই বিষয়টি সংসদে ওঠে।
বাঁধনের অভিযোগ, ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও শিশুসন্তানকে নিয়ে পার্কে অবস্থানের সময় একদল বাংলাদেশি তাঁকে ঘিরে ধরে। তাঁকে লক্ষ্য করে পানি, কোল্ড ড্রিংকস ও পচা ডিম ছোড়া হয় এবং শারীরিক ও মৌখিকভাবে হেনস্তা করা হয়। নিজের ফেসবুক লাইভে বাঁধন বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে তাঁর মনে হচ্ছিল তাঁকে মেরে ফেলা হতে পারে।
ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক বিরোধের অভিযোগও উঠেছে। বাঁধনের দাবি, গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে তাঁর ভ‚মিকার কারণেই তাঁকে টার্গেট করা হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও প্রতিবেদনে হামলাকারীদের কয়েকজনকে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঘটনার পূর্ণ তদন্ত ও আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ওই ঘটনার পর ঘটনার রেশ গড়ায় সরাসরি জাতীয় সংসদে। ৮ সেপ্টেম্বর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী বিষয়টি সংসদের নজরে এনে ইতালি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ঘটনাটিকে ‘অমার্জনীয়’ ও ‘নিন্দনীয়’ অপরাধ হিসেবে আখ্যা দেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সংসদে জানান, ইতালির পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে এবং রোমের বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিলানের কনস্যুলেটকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভেনিসের ঘটনা হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর আগে বহু বছর ধরেই বাঁধনের ব্যক্তিজীবন ও পেশাজীবন নানা বিতর্কে আলোচিত হয়েছে।
ভাঙা সংসার, তারপর কাস্টডি লড়াই: গত ২০১০ সালে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী মাশরুর সিদ্দিকী সনেটের সঙ্গে বিয়ে হয় বাঁধনের। ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁদের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ হয়। বিচ্ছেদের পর সাবেক স্বামী সংবাদমাধ্যমে দাম্পত্য জীবন নিয়ে একাধিক অভিযোগ করেন। আর্থিক বিরোধ, পারিবারিক কলহ, এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার পরিস্থিতি এবং মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগে বাধার মতো অভিযোগও তোলেন তিনি। এসব ছিল তাঁর নিজস্ব বক্তব্য; অভিযোগগুলোর সবকটির স্বাধীন সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিচ্ছেদের পর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ তৈরি হয় একমাত্র মেয়ে মিশেল আমানি সায়রার অভিভাবকত্ব নিয়ে। সন্তানকে কেন্দ্র করে সাবেক স্বামী-স্ত্রীর আইনি লড়াই প্রকাশ্য রূপ নেয়। গত ২০১৮ সালে আদালত মেয়ের অভিভাবকত্ব বাঁধনের কাছে দেওয়ার পর সেই অধ্যায়ের আইনি পরিণতি ঘটে। কিন্তু পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও ব্যক্তিগত বিরোধের আলোচনা দীর্ঘদিন সংবাদমাধ্যমে ছিল।
অভিযোগের পর অভিযোগ: সাবেক স্বামী সনেটের বক্তব্যে উঠে আসে আরও নানা অভিযোগ। তিনি দাবি করেন, তাঁকে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তাঁর ওপর হামলা হয়েছিল এবং তাঁর সম্পদ ও অর্থ নিয়ে বিরোধ হয়েছিল। এমনকি মেয়েকে দেখতে না দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
এর বাইরে বাঁধনের ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক, জীবনযাপন ও স্পষ্টবাদী বক্তব্য নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুবার বিতর্ক হয়েছে। কান চলচ্চিত্র উৎসবসহ আন্তর্জাতিক আয়োজনে তাঁর পোশাক নিয়ে সমালোচনা করেছেন নেটিজেনদের একাংশ। ফলে অভিনয়ের বাইরেও তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ বারবার জনআলোচনার বিষয় হয়েছে।
রাজনীতি যোগ করেছে নতুন মাত্রা: গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বাঁধনের সক্রিয় অবস্থান তাঁর বিতর্কের পরিধি আরও বাড়ায়। আন্দোলনের পক্ষে তাঁর অবস্থানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক আক্রমণ ও সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ ওঠে। সেই রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থানই শেষ পর্যন্ত ইতালির ঘটনাটিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে।
একজন অভিনেত্রীকে ঘিরে শুরু হওয়া ব্যক্তিগত বিতর্ক তাই এখন আর ব্যক্তিগত পরিসরে নেই। বিবাহবিচ্ছেদ ও সন্তানের অভিভাবকত্বের বিরোধ, সাবেক স্বামীর অভিযোগ, পোশাক নিয়ে বিতর্ক, রাজনৈতিক অবস্থান, সাইবার আক্রমণ-সবশেষে বিদেশের মাটিতে হেনস্তার অভিযোগ এবং তা নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা। এসব ঘটনাগুলোর এই ধারাবাহিকতাই বাঁধনকে ঘিরে বিতর্কের পরিধি কতটা বিস্তৃত হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এগুলো।
জ/বা