রেললাইনে লাশের মিছিল, আড়ালে কত খুন? ছাদেও ছিনতাইয়ে ঝরছে প্রাণ

খন্দকার হানিফ রাজা

অপরাধ

একটি রেললাইন। প্রতিদিন ছুটছে শত শত ট্রেন। সেই একই লাইনে একের পর এক পড়ে থাকছে মানুষের মরদেহ। কোনোটি ট্রেনে কাটা পড়ে, কোনোটি আত্মহত্যা, কোনোটি অসতর্কতার শিকার। কিন্তু সব লাশের গল্প কি এতটাই সরল? অন্যত্র হত্যার পর মরদেহ রেললাইনে ফেলে দিয়ে ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। ফলে রেললাইনে উদ্ধার হওয়া হাজার হাজার মরদেহের আড়ালে কতটি মৃত্যু আসলে হত্যাকাণ্ড—সে প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।

2026-09-05T21:49:22+06:00
2026-09-05T21:49:22+06:00
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইপেপার  বাংলা English
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
অপরাধ
ছয় বছরে ৫,৩৬২ মরদেহ উদ্ধার, সাড়ে ছয় বছরে ৯২ হত্যা মামলা
রেললাইনে লাশের মিছিল, আড়ালে কত খুন? ছাদেও ছিনতাইয়ে ঝরছে প্রাণ
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৪৯ পিএম 
ট্রেনের ছাদ থেকে যুবকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার
একটি রেললাইন। প্রতিদিন ছুটছে শত শত ট্রেন। সেই একই লাইনে একের পর এক পড়ে থাকছে মানুষের মরদেহ। কোনোটি ট্রেনে কাটা পড়ে, কোনোটি আত্মহত্যা, কোনোটি অসতর্কতার শিকার। কিন্তু সব লাশের গল্প কি এতটাই সরল? অন্যত্র হত্যার পর মরদেহ রেললাইনে ফেলে দিয়ে ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। ফলে রেললাইনে উদ্ধার হওয়া হাজার হাজার মরদেহের আড়ালে কতটি মৃত্যু আসলে হত্যাকাণ্ড—সে প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।

রেলওয়ে পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে রেললাইন থেকে ৫ হাজার ৩৬২টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। শুধু ২০২৪ সালেই পাওয়া গেছে ১ হাজার ১৭টি মরদেহ। এসব ঘটনায় ৯৯৮টি অপমৃত্যুর মামলা হলেও তদন্ত শেষে হত্যা মামলা হয়েছে মাত্র ছয়টি। অথচ ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক তদন্তে ৭৫ জনকে হত্যার শিকার বলে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। বছরভিত্তিক হিসাবও উদ্বেগজনক। ২০১৯ সালে ৯৫৪, ২০২০ সালে ৬৯৫, ২০২১ সালে ৬০২, ২০২২ সালে ১ হাজার ৫৬ এবং ২০২৩ সালে ১ হাজার ৩৭টি মরদেহ উদ্ধার হয়।

প্রতিদিন প্রায় তিন মৃত্যু: রেললাইনে মৃত্যুর বড় অংশই দুর্ঘটনা। রেলওয়ে পুলিশের হিসাবে, গত ১০ বছরে অসতর্কতা ও অসচেতনভাবে রেললাইন ব্যবহারের কারণে ৯ হাজার ২৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু গত তিন বছরেই মারা গেছেন ৩ হাজার ১৪০ জন—গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনজন।

রেললাইনে হাঁটা বা বসা, ঝুঁকিপূর্ণ লেভেলক্রসিং পার হওয়া, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ এবং হেডফোন বা মোবাইল ফোন ব্যবহার এসব মৃত্যুর অন্যতম কারণ। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন ৩ হাজার ৯১৮ জন। গত এক দশকে হেডফোন ব্যবহার করে রেললাইনে হাঁটা বা বসার সময় প্রাণ গেছে ৩৯৬ জনের।

দুর্ঘটনার ছদ্মবেশে খুন?: মৃত্যুর এই বিপুল সংখ্যার মধ্যেই সবচেয়ে বড় রহস্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে। রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে রেলওয়ে থানা এলাকায় ৯২টি হত্যা মামলা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই হয়েছে পাঁচটি। পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কোথাও কোথাও অন্যত্র হত্যা করে রেললাইনে মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়। এতে দুর্ঘটনার ছদ্মবেশ দেওয়ার পাশাপাশি আলামত নষ্টের সুযোগ তৈরি হয়।

চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে হলদিবাড়ি রেললাইনে হাত বাঁধা ও মাথা বিচ্ছিন্ন এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যার পর লাশ ফেলে রাখার সন্দেহ করে পুলিশ। জুনে নওগাঁর আত্রাইয়ে রেলস্টেশনের পাশে কলেজ শিক্ষক নেয়ামুল বাশিরের মরদেহ পাওয়া যায়। মাথায় আঘাতের চিহ্ন থাকায় স্বজনেরা হত্যার অভিযোগ করেন। পাবনার ঈশ্বরদীতেও ব্যবসায়ী বাদশা হোসেনের মাথাবিচ্ছিন্ন মরদেহ রেললাইনের পাশে পাওয়ার পর হত্যার অভিযোগ ওঠে।

ছাদেও নিরাপত্তা নেই: রেললাইনের পাশাপাশি চলন্ত ট্রেনের ছাদও এখন প্রাণঘাতী। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে উদয়ন এক্সপ্রেসের ছাদে ছিনতাইকারীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময় পড়ে মারা যান রেজাউল করিম নামে এক পল্লী বিদ্যুৎকর্মী। আহত হন তাঁর তিন সহযাত্রী। তাঁদের অভিযোগ, ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল টাকা, মোবাইল ও কাপড়চোপড় ছিনিয়ে নেয়। চলতি বছরের আগস্টে ফেনীর ছাগলনাইয়ায় চলন্ত ট্রেনের ছাদ থেকে সুজন মিয়া ও তাঁর ভাই শরিফ মিয়াকে ছিনতাইকারীরা ফেলে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। সুজন মারা যান, শরিফ গুরুতর আহত হন। জুনে তেজগাঁওয়ে চট্টলা এক্সপ্রেসে ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় শিক্ষার্থী তোফায়েল ইসলামকে ছুরিকাঘাত করা হয়।

তদন্তে ঘাটতি, বাড়ছে শঙ্কা: রেললাইন থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর সাধারণত অপমৃত্যুর মামলা হয়। পরে ময়নাতদন্তে হত্যার আলামত মিললে মামলা রূপ নেয় হত্যা মামলায়। কিন্তু ট্রেনে কাটা পড়ে মরদেহ বিকৃত হওয়ায় অনেক সময় আলামত শনাক্ত করা কঠিন হয়। পরিচয় শনাক্ত না হওয়া, ঘটনাস্থল নির্ধারণে জটিলতা এবং ফরেনসিক প্রতিবেদন পেতে দেরিও তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করে।

ফলে রেললাইন নিরাপদ করতে সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন সিসিটিভি, পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তাবেষ্টনী, অরক্ষিত ক্রসিং নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রেনে নিয়মিত টহল। একই সঙ্গে ছাদে যাত্রী ওঠা ও ছিনতাইকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত ও গভীর তদন্ত জরুরি। কারণ রেললাইনের প্রতিটি লাশ নিছক দুর্ঘটনার সংখ্যা নয়—কোনো কোনো লাশ হয়তো বহন করছে একটি চাপা পড়ে থাকা হত্যার গল্প।






Advertisement
Loading...
Loading...
অপরাধ - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]