বেশ কয়েক বছর ধরেই কঠিন সময় পার করছে পাকিস্তান ক্রিকেট। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপসহ আইসিসির সর্বশেষ চারটি টুর্নামেন্টের কোনোটিতেই সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি দলটি। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্টে টানা পরাজয়ের পর দেশটির ক্রিকেট পরিচালনা ও ঘরোয়া কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সাবেক প্রধান নির্বাচক ও প্রধান কোচ হারুন রশিদ দলের সাম্প্রতিক অধঃপতনের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ইমরান খানের আমলে ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোয় আনা বড় ধরনের পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন।
১৯৯২ সালে পাকিস্তানকে তাদের একমাত্র ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্ব দেওয়া ইমরান ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার মডেল অনুসরণ করে পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের নির্দেশ দেন তিনি। এর অংশ হিসেবে প্রথম শ্রেণির দলের সংখ্যা কমিয়ে ছয়টিতে নামিয়ে আনা হয়।
ইমরানের শাসনামলে ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো পর্যালোচনার জন্য গঠিত টাস্ক ফোর্সের সদস্য ছিলেন হারুন রশিদ। তার দাবি, টাস্ক ফোর্স একটি ‘হাইব্রিড মডেল’ প্রস্তাব করলেও ইমরান তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
‘স্ম্যাশ ইট’ স্পোর্টস চ্যানেলের একটি পডকাস্টে হারুন বলেন, ‘আমি ক্রিকেট বোর্ড ও টাস্ক ফোর্সের অংশ ছিলাম। আমার মনে আছে, আমরা যখন ইমরানের সঙ্গে বৈঠক করি, তখন ঘরোয়া ক্রিকেটের জন্য একটি হাইব্রিড মডেল প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু তিনি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দেন।’
২০২০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডে (পিসিবি) প্রধান নির্বাচক, প্রধান কোচ, হাই-পারফরম্যান্স ও ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান এবং টিম ম্যানেজারসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন হারুন। তার ভাষ্য, টাস্ক ফোর্সের পরামর্শ ছিল বিভাগীয় দলগুলোকে বহাল রেখে ধীরে ধীরে ঘরোয়া দলের সংখ্যা কমিয়ে আনা।
হারুন বলেন, ‘একজন প্রধানমন্ত্রী কতটা সময় দিতে পারেন বলে আপনি মনে করেন? আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের একটি সংশোধিত পরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আমরা তা করেছিলাম এবং সেটি ছিল একটি হাইব্রিড বা মিশ্র পদ্ধতির পরিকল্পনা।’
তার মতে, ইমরান ঘরোয়া ক্রিকেটে দলের সংখ্যা পাঁচ থেকে ছয়টির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন। হারুন জানান, টাস্ক ফোর্স শুরুতে আটটি দলের সমন্বয়ে একটি কাঠামোর প্রস্তাব করেছিল। এতে বিভাগীয় দলগুলোরও ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশগ্রহণের সুযোগ রাখার কথা ছিল। তবে ইমরান দলের সংখ্যা আরও কমিয়ে আনতে চেয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
হারুন বলেন, ‘আমরা ইমরানকে বলেছিলাম, আমাদের ক্রিকেটের জন্য হাইব্রিড মডেলটিই সবচেয়ে উপযুক্ত। কারণ এতে দলের সংখ্যা কমিয়ে আটটিতে আনা হলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে বিভাগীয় দলগুলোর অংশগ্রহণ বজায় রাখা হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু আমাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত এক বৈঠকে ইমরান সেই হাইব্রিড মডেলটি প্রত্যাখ্যান করে দেন। তিনি আটটি নয়, বরং ঘরোয়া কাঠামোতে সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে ছয়টি দল দেখতে চান। আমরা তাকে বলেছিলাম, নতুন ঘরোয়া কাঠামোয় ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনাই শ্রেয় হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো প্রধানমন্ত্রীর কথাই মেনে চলতে হয়। তার উদ্দেশ্য হয়তো ভালোই ছিল, কিন্তু পাকিস্তানের ক্রিকেটের জন্য তা ফলপ্রসূ হয়নি।’
২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর ইমরান বর্তমানে একাধিক মামলার মুখোমুখি হয়ে আদিয়ালা জেলে বন্দী রয়েছেন। এদিকে জাতীয় দলের ধারাবাহিকতাহীন পারফরম্যান্সের কারণে পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয় হয়ে আছে। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম দুটি টেস্টে শোচনীয় পরাজয়ের পর পিসিবি সাতজন খেলোয়াড়কে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরত পাঠায়।
পাকিস্তানের ঘরোয়া কাঠামোর সঙ্গে ভারতের ব্যবস্থারও তুলনা করেছেন হারুন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারত কেন শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দেশটির ঐতিহ্যবাহী ঘরোয়া ক্রিকেটের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তার মতে, ভারতের সাফল্যকে শুধু আইপিএলের কৃতিত্ব হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। বরং দেশটির দীর্ঘদিনের ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলো ক্রিকেটের শক্ত ভিত তৈরি করেছে।
হারুন বলেন, ‘মানুষ আইপিএল নিয়ে কথা বলে, কিন্তু ভুলে যায় ভারতে এখনও রঞ্জি ট্রফি, দুলীপ ট্রফি, মুশতাক আলী ট্রফি ও বিজয় হাজারে ট্রফির মতো টুর্নামেন্ট রয়েছে। এছাড়া তাদের রাজ্য-স্তরের অ্যাসোসিয়েশনগুলো স্বাধীন এবং ক্লাব পর্যায়েও তাদের নিজস্ব নিয়মিত ঘরোয়া টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়।’
পিসিবির সাবেক এই কর্মকর্তার মতে, পাকিস্তানেরও অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে আঞ্চলিক অ্যাসোসিয়েশন ও বিভাগগুলোকে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন দেওয়া প্রয়োজন। তার ভাষ্য, বর্তমানে পাকিস্তানের ক্রিকেটে প্রায় সব ক্ষমতাই পিসিবির হাতে কেন্দ্রীভূত। অথচ অতীতের মতো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে আঞ্চলিক অ্যাসোসিয়েশন ও বিভাগগুলোকে আরও বেশি স্বাধীনতা দেওয়া উচিত।
জ/উ