ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং দক্ষিণ লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের নতুন করে হুমকির মুখে সুয়েজ খালে জাহাজ চলাচল ও আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের জুলাইয়ে সুয়েজ খাল থেকে মিশরের আয় বেড়েছে ৪২ শতাংশ।
মিশরের রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ক্যাপমাসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে সুয়েজ খাল দিয়ে মোট ১ হাজার ৩৪০টি জাহাজ চলাচল করেছে। গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় এ সংখ্যা ২৭ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের জুনে খালটি অতিক্রম করেছিল ১ হাজার ২০৮টি জাহাজ। অর্থাৎ জুলাইয়ের পরিসংখ্যান সুয়েজ খালে জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধারের ধারাবাহিকতাই তুলে ধরছে। জুলাইয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর মধ্যে ৫২৬টি ছিল তেলবাহী ট্যাংকার। জুনে এ সংখ্যা ছিল ৪৮৫টি।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ে জাহাজ চলাচল বাড়ার অন্যতম কারণ সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি অংশের রুট পরিবর্তন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগর দিয়ে তেল পরিবহন বাড়িয়েছে। এতে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলও বেড়েছে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের হুতিদের নতুন হুমকির কারণে অনেক জাহাজ বাব আল-মান্দেব প্রণালি হয়ে দক্ষিণ লোহিত সাগরে প্রবেশ না করে উত্তরের পথে চলাচল করছে। এর ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে সুয়েজ খালের গুরুত্ব আবারও বাড়ছে।
ক্যাপমাসের হিসাবে, জুলাইয়ে সুয়েজ খাল থেকে মিশরের আয় হয়েছে ৫০ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পর এটিই খালটির সর্বোচ্চ মাসিক আয়।
ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সমুদ্রপথ হওয়ায় সুয়েজ খাল মিশরের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটন ও প্রবাসী আয়সহ খালটি দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তবে সাম্প্রতিক আয় বৃদ্ধির পরও জাহাজ চলাচল ও আয় এখনো গাজা যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে ফেরেনি।
২০২৪ সালের শুরুতে লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। এর পর থেকেই সুয়েজ খালে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের পতন দেখা দেয়।
পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ এড়িয়ে অনেক জাহাজ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে চলাচল শুরু করে। এতে সুয়েজ খাল থেকে মিশরের আয়ও ব্যাপকভাবে কমে যায়।
ক্যাপমাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সুয়েজ খাল থেকে মিশরের রেকর্ড ১০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল। ওই বছরের এপ্রিল মাসে প্রায় ২ হাজার ৩০০টি জাহাজ খালটি অতিক্রম করেছিল।
সাম্প্রতিক পুনরুদ্ধারের ধারাবাহিকতায় চলতি বছর সুয়েজ খালের আয় আরও বাড়বে বলে আশা করছে মিশর। গত সপ্তাহে স্থানীয় একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ওসামা রাবি বলেন, ২০২৬ সালে খালটির আয় ৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২৫ সালে এ আয় ছিল ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
বিনিয়োগ ব্যাংক ইএফজি হার্মেসের ম্যাক্রোইকোনমিক বিশ্লেষণের প্রধান মোহাম্মদ আবু বাশারের মতে, এশিয়াগামী তেল রপ্তানির রুট পরিবর্তন এবং ইউরোপের কয়েকটি শিপিং কোম্পানির লোহিত সাগরে কিছু সেবা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত সুয়েজ খালের পুনরুদ্ধারকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর সিদ্ধান্তের ওপরই আগামী দিনে সুয়েজ খালে জাহাজ চলাচল ও আয়ের প্রবৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করবে। তথ্যসূত্র: বিজনেস টাইমস
জ/উ