বেনাপোল স্থলবন্দরের ২৯ নাম্বার শেড থেকে মিথ্যা ঘোষনায় আমদানি করা ৫ কোটি টাকার পণ্য তিনটি ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবার বিকেলে বন্দরের ২৯ নম্বর শেডে এ ঘটনা ঘটে বলে বন্দর ও কাস্টমস সূত্র জানায়।
কাস্টমস সুত্র বলছে বড় ধরনের এই রাজস্ব ফাকির ঘটনায় সিএন্ডএফ এজেন্ট হিরু- আজিম সিন্ডিকেট জড়িত। তিনটি ট্রাকে প্রায় আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব ফাকি দেওয়া হয়েছে বেল কাস্টমস কমিশনার নিশ্চিত করেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে কম শুল্কের একটি আমদানি করা চালান বন্দরের শেডে রাখা হয়। পরে একই ধরনের প্যাকেট ও ওজন দেখিয়ে উচ্চ শুল্কের অন্য পণ্য বের করে নেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় কাস্টমসের পরীক্ষণ ও বন্দরের শেড ব্যবস্থাপনায় থাকা অসাধু বন্দরের শেড ইনচার্জদের সহযোগিতায় ৫ কোটি টাকার পন্য শেড থেকে ১০ মিনিটে বের করে নিয়ে যায় সিএন্ডএফ এজেন্ট হিরু- আজিম সিন্ডিকেট।
বাংলাদেশী তিনটি ট্রাক যশোর ট-১১-৩১৩৩, ঢাকা মেট্রো-ট-২০-৮৩৪৯ এবং ঢাকা মেট্রো-ট-২২-৭৪৭১ করে ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা, কসমেটিকস, কেমিক্যাল, ইমিটেশন সামগ্রী ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্য আনার বন্দর থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়।
বন্দরের ডেপুটি ডাইরেক্টর রুহুল আমিন জানান, বন্দরের সিসিটিভি ফুটেজে ট্রাকগুলোর চলাচলের তথ্য পাওয়া গেছে। ৩টি ট্রাকে করে পণ্য গুলো বের হয়েছে, বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত কাজ শুরু করা হয়েছে। পন্য চালানটির আমদানিকারক ঢাকার মৌলভীবাজারের সাদিয়া এন্টারপ্রাইজ ফেব্রিকস। পণ্য খালাসের দায়িত্বে ছিল সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল। পন্য চালান বন্দর থেকে বের করে নিয়ে যায় আজিম সিন্ডিকেট।
এ ঘটনায় বন্দরের ২৯ নম্বর শেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত বলে আভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, শেডে পণ্য ওঠানো-নামানো ও বের করার ক্ষেত্রে নিয়মিত নজরদারি থাকার পরও তিনটি ট্রাক কিভাবে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে গেল বন্দর থেকে।
বন্দর ব্যবহারকারী কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, কোনো চালান শেডে আসার পর পণ্যের প্যাকেজ ও পরিমাণ বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট শেড কর্মকর্তাদের। অতিরিক্ত বা ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য পাওয়া গেলে তা কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে জানানোর নিয়ম রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অসাধু আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে বা শুল্ক না দিয়েই বের করে দেওয়া হয়।
বন্দর ও কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, শুল্ক ফাঁকির ক্ষেত্রে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে নানা কৌশল ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাকি দিয়ে আসছে। হিরু আজিম সিন্ডিকেটের কারনে বৈধ সৎ আমাদানিকারক ও সিএন্ডএফ এজেন্টরা নানা ভাবে হয়রানির শিকার হয়ে থাকে।
বেনাপোল বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য সরানোর পাশাপাশি ‘নো-এন্ট্রি’ পদ্ধতিতে শুল্ক না দিয়েই বন্দর থেকে পণ্য বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তাঁদের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয়। আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, বন্দর ও কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ এ চক্রকে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসকে ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছিল। অর্থবছর শেষে আদায় হয় ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় তা ৭০২ কোটি টাকা কম।
কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৭১৩ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ মাসে বেনাপোল কাস্টমসে ১৩০টি জালিয়াতির ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। পণ্য পাচারের অভিযোগে করা চারটি মামলায় কাস্টমস, বন্দর, নিরাপত্তা সংস্থা ও ব্যবসায়ীসহ ৫৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, নিয়মিত জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়লেও মূল হোতাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে।যেসব সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স ব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ উঠছে, সেগুলোর কার্যক্রমও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনালের মালিক হাফিজুর রহমান হ্যাপীর জানান, আমার কাছ থেকে লাইসেন্সটি ব্যবহার করে হিরু -আজিম সিন্ডকেট। আমি এ ব্যাপারে কেছুই জানি না।
বেনাপোল বন্দরের ২৯ নম্বর শেড ইনচার্জ রিপন কুমারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “শেডে আসেন, সরাসরি কথা বলি।” এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী পরিচালক সেলিম বলেন, আমাদের কর্মকর্তারা শেডে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছেন। যারা জড়িত তাদের বিুরদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে ফৌজদারি মামলা করা হবে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার ফাইজুর রহমান জানান, বিসয়টি নিয়ে তদন্ত কাজ চলছে . হিরু -আজিম সিন্ডকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পণ্য কীভাবে শেড থেকে বের হলো, কারা অনুমতি দিলেন এবং এর সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। তিনটি ট্রাকে প্রায় আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব ফাকি দেওয়া হয়েছে।
জ/বা