কুড়িগ্রামের উলিপুরে তিস্তা নদীর ভাঙন নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে নদীপাড়ের মানুষের। নদীর স্রোতে একের পর এক জমি ও বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবার এখন আশ্রয়ের সন্ধানে। কোথাও ঘর সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে, আবার কোথাও শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় নদীর সঙ্গে লড়াই করছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন প্রতিরোধে নদীর পাড়ে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও সব জায়গায় তা কার্যকর হচ্ছে না। তাঁদের দাবি, শুধু পাড়ের ওপর জিও ব্যাগ রাখলে তিস্তার স্রোত সামলানো সম্ভব নয়। নদীর নিচের অংশ থেকে পাড়ের ওপর পর্যন্ত পাইলিং করে জিও ব্যাগ বসানো হলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে।
ভাঙন ঠেকাতে এমন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে এমন কিছু এলাকায় তুলনামূলকভাবে পাড় টিকে আছে বলে জানান স্থানীয়রা। বিপরীতে পাইলিং ছাড়া ফেলা জিও ব্যাগের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় সেগুলোও নদীতে চলে যাচ্ছে। ফলে প্রতিরোধকাজের পরও অনেক স্থানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
তিস্তার ভাঙনে প্রতিবছরই নতুন নতুন পরিবার বসতভিটা হারাচ্ছে। কেউ স্বজনের বাড়িতে গিয়ে উঠছেন, কেউ অন্যের জমি নিয়ে ঘর তুলছেন। আবার অনেকে চর জেগে উঠলে সেখানে নতুন করে বসতি গড়ছেন। এতে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার পাশাপাশি শিশুদের পড়াশোনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের প্রত্যাশা, নদীভাঙন বন্ধের পাশাপাশি স্থায়ী পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উলিপুর উপজেলার দলদলিয়া, থেতরাই, গুনাইগাছ ও বজরা ইউনিয়ন তিস্তা নদীর প্রভাবাধীন। নদীর ভাঙনে এসব ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। চাপরারপাড় হাজিপাড়া, উচ্চগ্রাম, বসনিয়াপাড়া, মুন্সিপাড়া, কর্পূরা, ঠুটাপাইকার, গোড়াইপিয়ার, শেখেরটেক, পাকার মাথা, দড়ি কিশোরপুর, বামনপাড়া, লাল মসজিদ, কুমারপাড়া, ভেন্ডারপাড়া, ফকিরপাড়া, মাঝিপাড়া, পশ্চিম বজরা, চর বজরা, বাঁধের মাথা, উত্তর সাদুয়া দামার হাট, খামার দামার হাটের নদীর পশ্চিমপাড়, সাতালস্ক, সন্তোষ অভিরাম ও কাজিরচকসহ বিভিন্ন এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
এসব এলাকার কোথাও কোথাও প্রতিরোধকাজ চললেও নতুন করে আবাদি জমি, গাছপালা ও বসতবাড়ি নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে। এতে ভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষের মধ্যে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
থেতরাই ইউনিয়নের গোড়াইপিয়ার এলাকার বাসিন্দা মান্নান মিয়া (৮০) দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার ভাঙনের সঙ্গে লড়ছেন। তিনি জানান, তাঁর এক একর জমি চার দফায় নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ১০ শতক জমি অবশিষ্ট ছিল। সেটি বাঁচাতে গত বছর নিজের খরচে ৬ হাজার বালুভর্তি বস্তা দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। কিন্তু চলতি বছর নদীর স্রোতে সেগুলোও ভেসে যায়। একই সঙ্গে তাঁর বাড়ির ৮ শতক জমিও নদীতে চলে গেছে। এখন তাঁর হাতে রয়েছে মাত্র ২ শতক জমি।
আব্দুল মান্নান বলেন, শেষ জমিটুকু রক্ষার জন্য বিভিন্ন চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধির কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইফুল ইসলাম বাদল তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিছু জিও ব্যাগ পাওয়া গেলেও সেগুলো পাইলিং ছাড়া পাড়ে ফেলা হয়েছে। ফলে স্রোতে সেগুলো সরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মাথা গোঁজার শেষ জায়গাটুকু রক্ষায় পাইলিং করে জিও ব্যাগ স্থাপনের দাবি জানান তিনি। বর্তমানে বাড়ির এক পাশে ছোট একটি চায়ের দোকান চালিয়ে সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।
দলদলিয়া ইউনিয়নের চাপরারপাড় হাজীপাড়ার বাসিন্দা মতিন আলীর ঘরও তিস্তার ভাঙনে নদীতে চলে গেছে। তিনি জানান, দুই দিন আগে বাড়ি হারানোর পর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। নিজের বসতভিটা রক্ষায় সহযোগিতা না পাওয়ায় অসহায় অবস্থায় দিন কাটছে তাঁর।
থেতরাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইফুল ইসলাম বাদল জানান, নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছরই থেতরাই ইউনিয়নের বহু পরিবার সর্বস্বান্ত হয়। জনপ্রতিনিধিদের উচিত বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তিনি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছেন।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তিস্তার ভাঙনের বিষয় অবগত আছি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জিও ব্যাগ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ভাঙনরোধে কাজও চলমান রয়েছে। ভাঙনরোধ ঠেকাতে আরও জিও ব্যাগের প্রয়োজন হলে তা সরবরাহ করা হবে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ,টি,এম আরিফ জানান, তিস্তা নদী ভাঙন এলাকাগুলোতে জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন রোধে কাজ চলমান রয়েছে। ভাঙনে যারা বাস্তহারা হচ্ছে তাদের আবেদনের ভিত্তিতে সরকারি খাস জমিতে তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে পুনর্বাসন করে দেয়া হবে। এছাড়া ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষজনের জন্য শুকনো খাবার ও চাল বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
জ/বা