সিরাজগঞ্জে ‘ভৌতিক চালকল’-এর নামে সরকারি বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বাস্তবে অস্তিত্ব নেই এবং দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ- এমন কিছু চালকলের নাম ব্যবহার করে সরকারি বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। এনিয়ে জেলায় নানা আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে।
অভিযোগ রয়েছে, সিরাজগঞ্জের খাদ্য বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রভাবশালী মিল মালিকদের যোগসাজশে এমন ‘ভৌতিক’ কারবার চলছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, চলতি বছর ৪৯ কেজি ধরে ২৫ হাজার ৪শ মে.টন চালের বিপরীতে ৩২১টি মিলের মাধ্যমে সেদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। আর একটি মিলের বিপরীতে ৪৮ টাকা কেজি করে ২৮২ মে.টন আতব চাল সংগ্রহ করা হয়েছে।
এছাড়াও এলএলসিডি গোডাইনে সংগৃহীত ১৭ হাজার ৮৬৮ মে.টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ধানগুলো সেদ্ধ করে চালের জন্য দরপত্র আহবান করা হয়েছে। এ ধানগুলো হাসকিং মিলে টনপ্রতি ১১৫০ টাকা ও অটোমিলে ১২৫০ টাকা নির্ধারন করা হয়েছে। তবে ৩২১ মিলের মধ্যে প্রায় শতাধিক ভৈতিক মিল রয়েছে। যার মধ্যে অনেক মিল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। রায়গঞ্জের চান্দাইকোনার ‘লুৎফা’ ও ‘ওমর’ সেমি অটো মিল প্রায় এক যুগ ধরে বন্ধ। অথচ একই চাতালে বাবা-ছেলের নামে চারটি লাইসেন্স ব্যবহার করে চলতি মৌসুমে ১৪৭ টন চালের বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
একইভাবে চালকল মালিক সমিতির নেতা এস এম সাগর সরকারের অচল মিল থাকা সত্ত্বেও তাঁরা অনৈতিক প্রভাবে ‘আনোয়ারা’ ও ‘সারা’ মিলের নামে ১৬৪ টন, ‘মামা-ভাগনে’ মিলে ২০৯ টন, কাগজপত্রে থাকা ভুয়া ‘খাজা’ মিলে ১৯১ টন এবং বিগত ১৫ বছর ধরে বন্ধ ‘আকন্দ’ সেমি অটো মিলে ৬২ টন চালের বরাদ্দ দেওয়া হয়। এমনকি কয়েকটি চালকলের বয়লার ও চুল্লিতে তুষের পরিবর্তে প্লাস্টিক, পলিথিন, গার্মেন্টসের ঝুট ও কাপড়ের বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে। এতে কালো ধোঁয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত। শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এসব মিলের বিরপরীতেও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এভাবেই ভৈতিক ও বন্ধ থাকা মিলের নামে চাল বরাদ্দ নিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারী অর্থ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশবাদী আন্দোলন (বাপার) সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক সাংবাদিক দীপক কুমার কর জানান, রায়গঞ্জে কাগজ-কলমে ১৪২টি চালকল থাকলেও প্রায় ৬০টির বিরুদ্ধে নানা বিতর্ক রয়েছে। অনেক মিলের সামনেই সাইনবোর্ড নেই। তুষের পরিবর্তে গার্মেন্টসের ঝুট ও প্লাস্টিকের বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্রে ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। এসব মিলের অনুকুলেও চাল বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে।
রায়গঞ্জ উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মোতালেব শেখ জানান, তাঁর চারটি মিলের মধ্যে বন্ধ থাকা একটি চালু করা হয়েছে। ব্যবসায় ছোটখাটো সমস্যা থাকতেই পারে।
সিরাজগঞ্জ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক আব্দুস রাজ্জাক জানান, প্রতিটি মিলের বিপরীতে দেখা যায় ৪০ থেকে ১০০টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। এখন একটি মিল বছরের একবার-দুবার বরাদ্দ পায়। সেজন্য হয়তো অনেকে মিলের অনুকুলে বরাদ্দ নিয়ে অন্য মিলে ধান সেদ্ধ করে চাল সংগ্রহ করে। এছাড়াও চাল ছাটাই ছাড়া খাদ্য অধিদপ্তর গ্রহন করেন না। ছাটাই করা মিল অনেকের নেই। সেক্ষেত্রে অন্য মিল থেকে ছাটাই করা হয়। তবে বন্ধ মিলে বরাদ্দ দেয়া হলেও অস্তিত্বহীন মিলে কোন বরাদ্দ দেয়া হয় নাই বলে তিনি আশ্বস্ক করেছেন।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. হারুন অর রশিদ বলেন, উপজেলা পর্যায়ের কমিটির সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই মিলগুলোতে চাল সরবরাহের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরেজমিন মিলগুলো সচল পেয়েছেন। অচল রয়েছে এমন কোন তথ্য আমাদের দপ্তরে নেই। তবে তিনি স্বীকার করে বলেন, একটি মিলের বিপরীতে বরাদ্দ দেয়া হলে সেই মিলের কোন সমস্যা থাকলে পাশ্ববর্তী মিল দ্বারা চাল তৈরী করে জমা দেন-এমন তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে মিলগুলো থেকে ২৫ হাজার ৪শ মে.টন চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। আরো সরকারী বরাদ্দ অনুযায়ী আরো সংগ্রহ করা হবে।
জ/বা