প্রয়াত পিতা রাজা পঞ্চম হারাল্ডের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও আবেগঘন বার্তা জানিয়ে নরওয়ের নতুন রাজা হিসেবে প্রথম ভাষণ দিয়েছেন অষ্টম হাকোন। রয়্যাল প্যালেসের একটি ডেস্কে বসে ধারণ করা টেলিভিশন বার্তায় বাবার ছবির পাশে দুটি জ্বলন্ত মোমবাতি ও এক তোড়া সাদা গোলাপ রেখে দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য দেন তিনি।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে হাকোন বলেন, ‘এত ভালো একজন বাবা হওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’ ৮৯ বছর বয়সী রাজা হারাল্ড বিরল রক্তের রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি প্রায় ৩৫ বছর নরওয়ের সিংহাসনে ছিলেন এবং প্রগতিশীল ও গণমানুষের রাজা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
বাবার মৃত্যুর পর ৫৩ বছর বয়সে সিংহাসনের দায়িত্ব নেওয়া হাকোন বলেন, ‘এখন আমার পালা।’ সামনে বড় দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি জনগণের পাশে থাকার এবং তাদের দুঃখ-কষ্টের প্রতি মনোযোগী থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
ভাষণে জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নতুন রাজা বলেন, তার পরিবার এমন একটি সমাজে বিশ্বাস করে, যা আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যেখানে প্রতিটি মানুষের মূল্য সমান। তিনি বাবাকে নিজের ও বোন রাজকুমারী মার্থা লুইসের আদর্শ পিতা, ছয় নাতি-নাতনির উষ্ণ ও রসিক পিতামহ এবং স্ত্রী রানি সোনিয়ার স্নেহশীল ও যত্নবান স্বামী হিসেবে স্মরণ করেন। শনিবার তাদের ৫৮তম বিবাহবার্ষিকী হওয়ার কথা ছিল-এ কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি হাকোন।
হাকোন বলেন, স্বাভাবিক নেতৃত্বের গুণে হারাল্ড পুরো পরিবারকে একসূত্রে ধরে রেখেছিলেন। তিনি সারাজীবন নিজের মূল্যবোধ ও দায়িত্বের প্রতি অবিচল ছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিজেদের মতো করে কাজ করা, নিজস্ব শৈলী খুঁজে নেওয়া ও নিজস্ব সত্তা ধরে রাখার কথা বলতেন।
রাজপ্রাসাদের সামনে হাজারো নরওয়েবাসীর ফুল, শ্রদ্ধাঞ্জলি ও মোমবাতি নিয়ে সমবেত হওয়ার বিষয়টিকে হৃদয়স্পর্শী অনুভূতি হিসেবে উল্লেখ করেন হাকোন। তিনি বলেন, পরিবার গভীর শোকের মধ্যে থাকলেও এত মানুষ তাদের সঙ্গে শোকে অংশ নেওয়ায় তারা শক্তি ও সান্ত্বনা পাচ্ছেন।
রাজা হারাল্ডের মৃত্যুর পর দেশটিতে জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। প্রাসাদের সামনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। তবে এখনো শেষকৃত্যের তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোয়ে রাজপ্রাসাদের বাইরে ফুল অর্পণ করে নতুন রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন। তিনি বলেন, নরওয়ে গভীর শোক ও কৃতজ্ঞতায় ঐক্যবদ্ধ। নতুন রাজা হাকোন আগামী মঙ্গলবার সংসদে আনুগত্যের শপথ নেবেন। পরে স্ত্রী রানি মেতে-মারিতকে নিয়ে একটি উৎসর্গ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তিনি, যা নরওয়ের ঐতিহ্যবাহী মুকুট পরানোর সরলীকৃত রূপ।
তবে রাজপরিবারের জন্য কঠিন ও সংবেদনশীল সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নিয়েছেন হাকোন। সাম্প্রতিক সময়ে পরিবারটি শারীরিক অসুস্থতা ও বিভিন্ন বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছে। রানি মেতে-মারিত দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী প্রয়াত জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে দীর্ঘ তিন বছরের বন্ধুত্বের কথা স্বীকার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছিলেন। ২০১৮ সাল থেকে পালমোনারি ফাইব্রোসিসে ভোগার পর তার ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। চিকিৎসকেরা আগামী বছরের আগে তার শারীরিক অবস্থা পুরোপুরি স্থিতিশীল ঘোষণা করবেন না বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া মেতে-মারিতের আগের সম্পর্কের ছেলে মারিয়াস বর্গ হইবি গত জুনে ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে চার বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। রায়ের বিরুদ্ধে বর্তমানে আপিল চলছে। হইবি রাজপরিবারের প্রাতিষ্ঠানিক সদস্য না হলেও হাকোন ও মেতে-মারিতের বিয়ের পর চার বছর বয়স থেকেই তিনি রাজপরিবারের সঙ্গে বেড়ে উঠেছেন।
হাকোনের বোন মার্থা লুইসও ২০২৪ সালে এক আমেরিকান স্বঘোষিত ও বিতর্কিত ঝাড়ফুঁককারীকে বিয়ে করে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার পর রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।
ভাষণে এসব বিতর্কের সরাসরি উল্লেখ না করে হাকোন বলেন, কঠিন সময়েও নিজেদের ভেতরে এবং একে অপরের পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তাদের পরিবার গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। তিনি স্ত্রী মেতে-মারিত ও ক্রাউন প্রিন্সেস ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করার প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে একসঙ্গে কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে তা কেউ জানেন না। তবে ভালো-মন্দ উভয় সময়েই সবাই একে অপরের পাশে থাকবেন-এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত।
রাজা হারাল্ড জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত জনপ্রিয় থাকলেও চলতি বছর প্রকাশিত ‘আফতেনপোস্টেন’-এর এক জরিপে রাজতন্ত্রের প্রতি জনসমর্থন ২০২৪ সালের ৭২ শতাংশ থেকে কমে ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে নরওয়ের রাজপরিবার বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বিবিসিকে বলেছেন, পরিবারকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা বিতর্ক থাকলেও হাকোন অত্যন্ত সম্মানিত ও পরিশ্রমী। এসব পরিস্থিতি সামলে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তার রয়েছে। সূত্র: বিবিসি
জ/উ