খন্দকার হানিফ রাজা

জাতীয়

2026-08-29T19:07:22+06:00
2026-08-29T19:07:22+06:00
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলা English
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
জাতীয়
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে ক্ষমতা সংকোচন
আইনে স্বাধীন, বাস্তবে কতটা স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন?
নিয়োগ ও অর্থায়নেও সরকারের প্রভাবের অভিযোগ
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:০৭ পিএম 
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করবে যে প্রতিষ্ঠান, সেই প্রতিষ্ঠানই যদি অভিযুক্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থার ওপর তথ্য ও প্রতিবেদনের জন্য নির্ভরশীল হয়, তাহলে তার স্বাধীনতা কতটা কার্যকর থাকবে- এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬-এর খসড়া নিয়ে। আইনের খসড়ায় কমিশনকে ‘স্বাধীন প্রতিষ্ঠান’ বলা হলেও শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত, কমিশনার নিয়োগ, অর্থায়ন ও জনবল ব্যবস্থাপনায় সরকারের প্রভাবের সুযোগ থাকায় এর প্রকৃত স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গত ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া খসড়াটি এখন জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপনের কথা। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০০৯ সালের আইনের তুলনায় কমিশনের কিছু ক্ষমতা বাড়ানো হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়—পুলিশ, র‌্যাব, সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা- বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

অভিযুক্তের কাছেই তদন্তের প্রতিবেদন: সাধারণ কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশন অভিযোগ গ্রহণ, প্রাথমিক যাচাই, সাক্ষী তলব, নথি সংগ্রহ ও ঘটনাস্থল পরিদর্শনের মতো ক্ষমতা পাবে। অভিযোগের ভিত্তিতে কিংবা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও তদন্তের সুযোগ থাকছে। অভিযোগ আমলে নেওয়ার বিষয়ে ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত এবং সাধারণভাবে তিন মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বিধানও রাখা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে মামলা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা ক্ষতিপূরণের সুপারিশের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগের আসামি যদি কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার সদস্য হন, তখন পরিস্থিতি ভিন্ন। খসড়ার সংশ্লিষ্ট ধারায় কমিশনকে প্রথমে অভিযুক্ত বাহিনী বা সরকারের কাছ থেকে ঘটনার প্রতিবেদন চাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্তের শুরুতেই তার কাছ থেকে প্রতিবেদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হচ্ছে।

এ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশনকে যে স্বাধীন অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, নতুন খসড়ায় তা সংকুচিত করা হয়েছে। সংস্থাটি এই বিধান বাতিল করে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খানের ভাষ্য, শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের এখতিয়ার না থাকলে মানবাধিকারের মৌলিক চেতনাই অগ্রাহ্য হবে।

নিয়োগেও প্রভাবের প্রশ্ন: কমিশনের স্বাধীনতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো নেতৃত্ব নির্বাচন। প্রস্তাবিত কাঠামোয় একজন চেয়ারম্যান ও চারজন সার্বক্ষণিক কমিশনার নিয়ে কমিশন গঠিত হবে। তাদের বাছাইয়ে নয় সদস্যের একটি কমিটি থাকবে। এতে জাতীয় সংসদের স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি ও বিরোধী দলের একজন করে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন মনোনীত একজন অধ্যাপক ও রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুজন নাগরিক প্রতিনিধি থাকার কথা বলা হয়েছে।

ফলে নয় সদস্যের কমিটিতে রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সদস্যদের প্রভাব বেশি থাকার সুযোগ রয়েছে। সিদ্ধান্ত হবে উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে। ভোট সমান হলে সভাপতির নির্ণায়ক ভোট থাকবে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে বাছাই কমিটির নেতৃত্বে প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক এবং সাংবাদিক ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিধান ছিল। নতুন খসড়ায় সেই কাঠামো পরিবর্তন করে স্পিকার, দুই মন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ভ‚মিকা বাড়ানো হয়েছে। টিআইবির মতে, এতে কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাজেটেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ: খসড়ায় ‘কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা’ নামে পৃথক বিধান থাকলেও অর্থের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি কমিশনের হাতে যাচ্ছে না। প্রতি অর্থবছরে কমিশনের জন্য সরকার অর্থ বরাদ্দ করবে। বরাদ্দকৃত অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যয়ের জন্য পূর্বানুমোদন না লাগলেও কত অর্থ বরাদ্দ হবে, সেটি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

টিআইবি বলেছে, কমিশনের বাজেটকে একতরফাভাবে সরকারি বরাদ্দনির্ভর না রেখে এর আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জনবল নিয়েও অস্বস্তি: কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ সরকারি চাকরি থেকে প্রেষণে নিয়োগের সুযোগও রাখা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী মোট জনবলের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রেষণে আসতে পারবেন। এমনকি কমিশনের তদন্ত দলেও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ থাকছে।

যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে, সেই প্রশাসনের কর্মকর্তারাই যদি কমিশনের তদন্ত কাঠামোর অংশ হন, তাহলে তদন্ত কতটা স্বাধীন হবে- এ প্রশ্নও উঠছে।

‘বি’ থেকে ‘এ’ মর্যাদার পথ কোথায়?: বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বর্তমানে গ্যানরির ‘বি’ মর্যাদায় রয়েছে। শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের সীমাবদ্ধতা, নিয়োগে সরকারের প্রভাব এবং পর্যাপ্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে আলোচিত।

নতুন আইনে অভিযোগ তদন্ত, ক্ষতিপূরণ, অন্তর্বর্তী সুরক্ষা ও আটকস্থল পরিদর্শনের মতো কিছু ক্ষমতা বাড়ানো হলেও মূল সংকটগুলো কতটা কাটছে, সেটিই বড় প্রশ্ন। টিআইবিও বলেছে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন খসড়ায় এমন কিছু পরিবর্তন এসেছে, যা একটি স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে দুর্বল করতে পারে।

ফলে কাগজে ‘স্বাধীন প্রতিষ্ঠান’ ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। যে প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করবে, তার নিয়োগ, তদন্ত, অর্থ ও জনবল- এই চার ক্ষেত্রেই কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না গেলে আইনটি কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


জ/বা




  বিষয়:   জাতীয়  মানবাধিকার কমিশন 



Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয় - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]