মুদি দোকান কিংবা বাজারে সারি সারি রঙিন ফলমূল ও শাকসবজি দেখলে বোঝার উপায় নেই-গত সাত দশকে এসব খাদ্যপণ্যের পুষ্টিমান ধীরে ধীরে কমেছে। একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, কয়েক দশক আগে চাষ করা ফল, শাকসবজি ও শস্যের তুলনায় বর্তমানে উৎপাদিত এসব ফসলে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, রিবোফ্লাভিন ও ভিটামিন সি-এর পরিমাণ কমে গেছে। ‘ফুডস’ সাময়িকীর ২০২৪ সালের একটি সংখ্যায় প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের পর্যালোচনায় এ পুষ্টি হ্রাসকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের জন্য এটিকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গবেষকেরা যেহেতু মানুষকে ক্রমেই উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছেন, তাই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সিয়াটলের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওমরফোলজির অধ্যাপক ডেভিড আর. মন্তগোমারি বলেন, ‘পুষ্টির হ্রাস আমাদের শরীরকে দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে সক্ষম করে এমন উপাদানগুলো থেকে বঞ্চিত করবে। এতে প্রতিরোধমূলক ওষুধ হিসেবে খাবারের ভূমিকা ও কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টি এবি বলেন, যারা প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে তাজা ফল ও শাকসবজিকে প্রাধান্য দেন, তাদের ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, এর অর্থ দাঁড়ায়—আগের প্রজন্মের মানুষ যে খাবার খেতেন, তা বর্তমানের খাবারের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর ছিল।
আধুনিক কৃষিতে পুষ্টি কমছে
বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, পুষ্টি হ্রাসের অন্যতম কারণ আধুনিক কৃষিব্যবস্থা। এসব পদ্ধতিতে ফসলের ফলন বাড়ানো সম্ভব হলেও মাটির স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত সেচ, সার প্রয়োগ এবং ফসল সংগ্রহের কিছু পদ্ধতির কারণে উদ্ভিদ ও মাটির ছত্রাকের মধ্যে প্রয়োজনীয় মিথস্ক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে মাটি থেকে উদ্ভিদের পুষ্টি শোষণের সক্ষমতাও কমে যায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি। এসব পরিবর্তনও ফলমূল, শাকসবজি ও শস্যের পুষ্টিমান কমাতে ভূমিকা রাখছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ তথ্যের কারণে স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে বৈচিত্র্যময় ফলমূল, শাকসবজি ও তাজা শস্য খাওয়া বন্ধ করা উচিত নয়। বরং খাদ্য কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, সে বিষয়ে ভোক্তাদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
অধ্যাপক মন্তগোমারি বলেন, ‘বেশিরভাগ মানুষই জানেন যে আমরা কী খাচ্ছি তা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের খাদ্য কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, সেটিও যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে কৃষি পদ্ধতি নিয়ে ভাবার জন্য সাধারণ মানুষের সামনে একটি নতুন ও শক্তিশালী কারণ তৈরি হয়। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাদযোগ্য জমি হারানোর কোনো সুযোগ আমাদের নেই। নতুন করে মাটির ক্ষতি রোধ করতে হবে এবং ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত জমির উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করতে হবে।’
‘উদ্বেগজনক’ পুষ্টি হ্রাসের চিত্র
এ বিষয়ে বড় বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোর একটি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে ‘জার্নাল অব দ্য আমেরিকান কলেজ অব নিউট্রিশন’-এ। অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ১৯৫০ ও ১৯৯৯ সালে ইউএসডিএ প্রকাশিত পুষ্টি তথ্য ব্যবহার করে ৪৩ ধরনের ফসলে ১৩টি পুষ্টি উপাদানের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেন। এসব ফসলের মধ্যে অ্যাসপারাগাস, শিম, স্ট্রবেরি ও তরমুজও ছিল।
গবেষণায় কাঁচা ফলমূল ও শাকসবজিতে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের পরিমাণ কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। শক্ত হাড় ও দাঁত গঠন এবং স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য এসব উপাদান গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনে প্রয়োজনীয় আয়রন এবং ফ্যাট ও ওষুধের বিপাকক্রিয়ায় ভূমিকা রাখা রিবোফ্লেভিনের মাত্রাও কমেছে। শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর বৃদ্ধি ও মেরামত এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি-এর পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে।
পুষ্টি উপাদান ও ফল-সবজির জাতভেদে হ্রাসের মাত্রায় পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিকভাবে প্রোটিনের ক্ষেত্রে তা ৬ শতাংশ থেকে রিবোফ্লেভিনের ক্ষেত্রে ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত ছিল।
বিশেষ করে ব্রকলি, কেইল ও সরিষা শাকে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অন্যদিকে বিট শাক, শসা ও শালগম শাকে আয়রনের মাত্রায় বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। অ্যাসপারাগাস, ওলকপি শাক, সরিষা শাক ও শালগম শাকেও ভিটামিন সি-এর উল্লেখযোগ্য হ্রাস পাওয়া গেছে।
পরবর্তী গবেষণাগুলোও এই প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফল দিয়েছে। ‘ফুডস’ সাময়িকীর ২০২২ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় উৎপাদিত অধিকাংশ সবজিতে আয়রনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও কয়েকটি সবজিতে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
মিষ্টি ভুট্টা, লাল আলু, ফুলকপি, বরবটি, সবুজ মটরশুঁটি ও ছোলায় আয়রনের পরিমাণ ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। তবে হাস অ্যাভোকাডো, মাশরুম ও সিলভারবিট-যা বিট শাকের আরেক নাম-এ আয়রনের পরিমাণ বরং বেড়েছে।
দানাদার শস্যেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। ‘সাইন্টিফিক রিপোর্টস’ সাময়িকীর ২০২০ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, ১৯৫৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে গমে প্রোটিনের পরিমাণ ২৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, জিংক ও ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু নিরামিষ বা উদ্ভিদভিত্তিক খাবার গ্রহণকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অধ্যাপক মন্তগোমারির মতে, গরু, শুকর, ছাগল ও ভেড়াও বর্তমানে তুলনামূলক কম পুষ্টিসমৃদ্ধ ঘাস ও শস্য খাচ্ছে। এর ফলে মাংসসহ অন্যান্য প্রাণিজ পণ্যের পুষ্টিমানও আগের তুলনায় কমতে পারে।
কেন কমছে খাবারের পুষ্টি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সমস্যার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ফলন বাড়ানোর লক্ষ্যে গড়ে ওঠা আধুনিক কৃষিপদ্ধতি।
অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডোনাল্ড আর. ডেভিস বলেন, ‘উদ্ভিদকে আকারে বড় ও দ্রুত বেড়ে ওঠার কৌশল শেখার কারণে এগুলো মাটি থেকে পুষ্টি শোষণ কিংবা নিজেদের মধ্যে পুষ্টি সংশ্লেষণের গতি বজায় রাখতে পারছে না।’
অবসরপ্রাপ্ত এই রসায়নবিদ ও পুষ্টিবিষয়ক গবেষক ২০০৪ সালের ওই গবেষণার প্রধান লেখক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে প্রকাশিত আরও কয়েকটি গবেষণাপত্রেও তিনি অন্যতম লেখক হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অধিক ফলনের কারণে মাটিতে থাকা নির্দিষ্ট পরিমাণ পুষ্টি এখন বেশি পরিমাণ ফসলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে ফলমূল ও শাকসবজির পুষ্টির ঘনত্ব কমে যাচ্ছে।
ডেভিস বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, কৃষকেরা তাদের ফসলের ওজনের ভিত্তিতে মূল্য পান। তাই তারা এমন কাজ করতেই উৎসাহিত হন, যা পুষ্টির পরিমাণের জন্য ভালো নয়।’
উচ্চ ফলনশীল ফসলের চাষের কারণে মাটির ক্ষতিও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। গম, ভুট্টা, ধান, সয়াবিন, আলু, কলা, মিষ্টি আলু ও তিসির মতো ফসল নির্দিষ্ট কিছু উপকারী ছত্রাকের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে মাটি থেকে পুষ্টি ও পানি শোষণের সক্ষমতা বাড়ায়। অধ্যাপক মন্তগোমারির মতে, এসব ছত্রাক উদ্ভিদের শিকড়ের সম্প্রসারিত অংশের মতো কাজ করে।
কিন্তু উচ্চ ফলনকেন্দ্রিক চাষাবাদ মাটির পুষ্টি দ্রুত নিঃশেষ করে দিতে পারে। এর ফলে উদ্ভিদের সঙ্গে মাইকোরাইজাল ছত্রাকের উপকারী সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতাও কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের ক্রমবর্ধমান মাত্রাও খাবারের পুষ্টিমান কমিয়ে দেওয়ার একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। ফলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং খাদ্যের পুষ্টিমান-এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ/উ