মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পথে ফেরাতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
আজ বুধবার রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সেমিনারে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকসহ অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নেন।
ড. তিতুমীর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করলেও সরকার যদি ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আহরণে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে না পারে, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও শিল্পনীতিকে একই লক্ষ্য সামনে রেখে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
সেমিনারে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি, রাজস্ব সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, দেশের অর্থনীতি এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট ও সীমিত রাজস্ব সক্ষমতাসহ একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত নীতি কাঠামো প্রয়োজন।
দীর্ঘদিনের দুর্বল শাসনব্যবস্থা, অনিয়ম ও নীতিগত ত্রুটির কারণে অর্থনীতিতে কাঠামোগত চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব এখনো মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে। তবে ধারাবাহিক সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে ড. তিতুমীর বলেন, কেবল করহার বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা যাবে না। উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়িয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
তিনি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশন, করজাল সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
জ্বালানি খাত নিয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, বিশেষ করে সৌরশক্তির সম্প্রসারণ, স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. তিতুমীর বলেন, অর্থনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছাতে হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার শিল্প পুনরুজ্জীবন, উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সেমিনারে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরাও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নীতিগত ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
তারা বলেন, রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সংস্কার ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত গতি অর্জন কঠিন হবে। একই সঙ্গে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয়, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা গেলে দেশের অর্থনীতি নতুন গতিপথে এগিয়ে যেতে পারে।
জ/উ