জেলার অন্যতম জনবসতিসম্পন্ন মুকসুদপুর পৌরসভার বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত হতাশাজনক হয়ে পড়েছে। থমকে গেছে মুকসুদপুর পৌরসভার সামগ্রিক উন্নয়নমুলক কর্মকান্ড। পৌরবাসীর জীবন ধুঁকে ধুঁকে চলছে। অথচ দেখার কেউ নেই। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে মুকসুদপুর পৌরসভার বেহাল দশা। মুল পৌর এলাকায় কয়েকটি মাত্র রাস্তা। বেশিরভাগই ভাঙ্গাচোরা। এমনিতেই চলাচলের অযোগ্য। তার উপর বৃষ্টি নামলে মড়ার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো অবস্থা হয়।
২০০০ সালে মুকসুদপুরকে পৌরসভা ঘোষণা করা হয়। মোট ১৭.২ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট মুকসুদপুর পৌরসভার জনসংখ্যা ২৮ হাজার ৭ শত ৬২ জন। এতে ওয়ার্ড সংখ্যা নয়টি। পৌরসভাভুক্ত গ্রামের সংখ্যা ১৩ টি এবং মৌজা সংখ্যা ১১ টি। মুকসুদপুর পৌরসভা কর্তৃক পরিচালিত জরীপ রিপোর্ট মোতাবেক পৌর এলাকায় বসবাসকারী পরিবার বা খানার সংখ্যা ৫২৪৩ টি। পৌরসভার হোল্ডিং সংখ্যা ৬২১৮ টি।
এ পৌরসভায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা নয়টি। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চারটি। মাদ্রাসা রয়েছে চারটি। মাধ্যমিক বিদ্যালয় চারটি এবং বালিকা বিদ্যালয় একটি। কলেজ রয়েছে ১টি। পৌরসভার নিজস্ব কোনো ওভারহেড পানির ট্যাংক নেই। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দুটি ওভারহেড পানির ট্যাংক রয়েছে যা পৌর এলাকার বাইরে অবস্থিত। ওই দুটি ট্যাংক দিয়ে ৩২ কিলোমিটার সাপ্লাই লাইনে পানি সরবরাহ করা হয়।
পৌরসভায় স্যানিটেশনের আওতায় রয়েছে মাত্র ১১২০ টি পরিবার। নলকুপ রয়েছে ১০১২ টি যার বেশিরভাগই অকেজো। পৌর এলাকায় ইটের রাস্তা রয়েছে ২০ কিলোমিটার, কার্পেটিং রাস্তা ২৫ কিলো মিটার,মাটির রাস্তা ৫ কিলোমিটার,আরসিসি রাস্তা ১৫ কিলোমিটার এবং সিসি রাস্তা ১০ কিলোমিটার । এসব সরু রাস্তার অধিকাংশ চলাচলের অযোগ্য হলেও সংস্কার বা পুন:নির্মাণের উদ্যোগ নেই দীর্ঘকাল। মাত্র দুই কিলোমিটার ড্রেনের সবটাই অচল ছিলো ।
পৌরসভার প্রশাসক উদ্যোগ নিয়ে ড্রেনগুলি কিছুটা সংস্কার করা হয়। পনেরটি পাবলিক ল্যাট্রিন থেকেও না থাকার মতো অবস্থা। রাতের বেলায় এ পৌরসভায় আলো জ্বলেনা। স্ট্রীট লাইট ৪১ টি এবং সোলার লাইট ৩৫০ টি থাকার কথা থাকলেও তা নেই। অধিকাংশ রাতের বেলা জ্বলেনা। পৌর এলাকায় তিন কিলোমিটার বৃক্ষ রোপন করা হলেও নেই কোনো পার্ক। মানুষের চিত্ত বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই। বাসস্ট্যান্ড বা যাত্রী ছাউনি নেই। পৌর এলাকায় বর্জ্য ফেলার সুনির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। সব ধরনের বর্জ্য ফেলা হয় পৌরসভার মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে এবং কুমার নদে।
এ মহাসড়কটির মুকসুদপুর পৌর এলাকায় কার্যকর কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনায় হতাহত হয় অনেক। মহাসড়কটির এ অংশে ডিভাইডার, আইল্যান্ড, রোড ক্রসিং, ফুট ওভার ব্রীজ ইত্যাদি জরুরীভিত্তিতে প্রয়োজন। পৌরসভায় হাটবাজারের সংখ্যা চারটি হলেও নেই কোনো সরকারি মার্কেট। ব্যবসা পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণকারীর সংখ্যা ১৩০০। এ পৌরসভায় ৭৫% শিক্ষার হার হলেও দারিদ্র্যের হার ৩০%।
মুকসুদপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস ছালাম খানের সাথে পৌরসভার হালহকিকত নিয়ে আলাপ করা হলে তিনি বলেন, পৌরসভার বর্তমান অবস্থা হতাশাজনক। এসব সমস্যা নিয়ে আমরা আমাদের গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিমের সাথে কথা বলেছি। তিনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।
মুকসুদপুর পাইলট (বালক) উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শংকর কুমার চক্রবর্তী বলেন,আমার স্কুলের সাথেই একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এদুটি স্কুলের প্রবেশ মুখে প্রতিদিন বাজার বসে। বাজারটি স্থায়ী হয়ে গেছে। এতে স্কুলের শিক্ষার্থীদের চলাচলে বিভিন্ন ধরনের অসুবিধা হয়। রাস্তাগুলি সরু ও ভাঙ্গাচোরা। বৃষ্টির সময় নিদারুণ অসুবিধায় পড়তে হয় সবাইকে। আমি জেলা পর্যায়ের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য কথা বলেছি। তারা সমাধানের জন্য আশ্বাস দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। স্কুলের সামনে থেকে বাজার সরানো বা রাস্তার উন্নয়ন হয়নি।
মুকসুদপুর পৌরসভার বর্তমান চালচিত্র নিয়ে আলাপ করা হলে পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো:নাহিদ হোসেন বলেন, মুকসুদপুর পৌরসভার উন্নয়নের জন্য কোনো ফান্ড নেই। আমাদের আয় ও জনবল সীমিত। সরকারি সাহায্য তেমন মেলেনা। পৌরসভার আয়ের খাত হলো পানি ও হোল্ডিং ট্যাক্স এবং সাবরেজিস্টার অফিস থেকে প্রাপ্ত অর্থ। গত অর্থ বছরে আমরা হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করেছি প্রায় ৮০ লাখ টাকার মতো। এসময় সাবরেজিস্টার অফিস থেকে পাওয়া গেছে এক কোটি টাকার কিছু বেশি। পানির বিল বাবদ যা পাওয়া যায় তাতে লোকসান গুনতে হচ্ছে। প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে আমাদের বেতন পরিশোধ করতে হয়। বর্তমানে পৌরসভায় মোট ৬৮ টি পদে জনবল থাকার কথা থাকলেও রয়েছে মাত্র ৬ জন। চব্বিশ জন রয়েছে অস্থায়ীভাবে। আমাদের প্রায়ই পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, পানি সরবরাহের জন্য পৌর এলাকার মধ্যে ওভারহেড ট্যাংক স্থাপন করা জরুরি। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের যে দুটি ওভাহেড ট্যাংক পৌরসভাকে ব্যবহারের জন্য দিয়েছে তার জমির মূল্য পরিশোধ করা হয়নি। জমির মূল্য পরিশোধের চিন্তা চলছে। পৌর এলাকার রাস্তাঘাট সংস্কার ও নির্মাণ করা প্রয়োজন। একটি বর্জ্য শোধনাগার নির্মান করা দরকার। মিনি স্টেডিয়াম সংস্কার করাও এখন সময়ের দাবী।
উপ সহকারি প্রকৌশলী বলেন, মুকসুদপুর পৌরসভার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য আমরা রুরাল আরবান টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (আরআরটিডিপি) আওতায় মোট দুইশত চুরানব্বই কোটি পনের লাখ টাকার চব্বিশটি স্কীম জমা দিয়েছি। এ প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে পৌরবাসির নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সহজ হবে। আশা করছি অন্যান্য পৌরসভার মতোই মুকসুদপুর পৌরসভার জন্য শীঘ্রই প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাবে।
এ বিষয়ে জানতে মুকসুদপুর পৌরসভায় প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মাহামুদ আশিক কবীরের সাথে আলাপ করা হলে তিনি বলেন, আমরা মুকসুদপুর পৌরসভার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। ইতিপূর্বে মুকসুদপুরকে পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। আমরা প্লান করে এগুতে চাচ্ছি।
তিনি বলেন, বাজারের শেড স্থাপন,রাস্তা উন্নয়ন,ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার,দুটি খাল খনন ও সৌন্দর্য বর্ধন,পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান প্রথমে করতে চাই। ধীরে ধীরে মুকসুদপুরকে একটি নান্দনিক পৌরসভা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
প্রশাসক আরও বলেন, এসব ব্যাপারে আমি গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান সেলিমের সাথে কথা বলেছি। তার দিক নির্দেশনা ও সহায়তায় উন্নয়নমুলক কাজ পরিচালিত হবে। আমরা আরইউটিডিপি প্রকল্পে ২৪ টি স্কীম অন্তর্ভুক্ত করেছি। প্রথম দিকে প্রায় বিশ কোটি টাকার একটি স্কীম শীঘ্রই পাস হবে বলে আশা করছি। প্রকল্পের আওতায় সমুদয় অর্থ বরাদ্দ হলে মুকসুদপুরকে একটি আদর্শ পৌরসভা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।