দীর্ঘ সময় সাগরে টানা মোতায়েন, নাবিকদের কঠিন কর্মপরিবেশ ও মানসিক চাপ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা এবং তদন্তের প্রেক্ষাপটে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মাসের পর মাস বন্দরে না গিয়ে দায়িত্ব পালন করায় জাহাজটির ক্রুদের মধ্যে ক্লান্তি, হতাশা ও মানসিক চাপ বাড়ার খবর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নাবিকদের জীবনযাত্রার মান, খাবার এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও তাদের পরিবার ও আইনপ্রণেতাদের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন শেষে সমালোচনার চাপ কমানো এবং নাবিকদের স্বস্তি দিতে রণতরীটি দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এক বিবৃতিতে হুং কাও বলেন, ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন তাদের দায়িত্ব সফলভাবে শেষ করেছে এবং পালাবদলের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শিগগিরই বাড়ি ফিরবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে জানানো হবে। তবে আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, আমাদের নাবিক ও মেরিন সেনাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাই সর্বাধিক অগ্রাধিকার পাবে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘অভিযান সফল করা। সেনাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। এভাবেই আমরা নেতৃত্ব দিই।’
কাও জানান, নভেম্বরে সান ডিয়েগো থেকে যাত্রা করার পর ২৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে আব্রাহাম লিংকনকে সাগরে মোতায়েন রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল অভিযানের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা মোতায়েন করা কঠিন, যুদ্ধকালীন সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে এবং যুদ্ধ একটি নরক, যার ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বা দৈনন্দিন রুটিন ঠিক থাকে না।’
কাও আরও বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রের অন্যতম কঠিন দিক হলো আমাদের সেনা সদস্যদের জেনেশুনে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। সেরা পরিকল্পনা ও যোগাযোগ থাকার পরও পরিবর্তন এবং অনিশ্চয়তা সবসময়ই থেকে যাবে। আমাদের সাফল্য নির্ভর করে আমরা কীভাবে নিজেদের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিই তার ওপর।’
নাবিক ও মেরিন সেনাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নাবিক এবং মেরিন সেনাদের কাছ থেকে তাদের সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার প্রত্যাশা করা হয় এবং তারা সবসময়ই তা করে। একজন নেতার দায়িত্ব হলো অভিযানের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে তাদের অধীনস্তদের যথাসম্ভব সর্বোত্তম যত্ন নেওয়া।’
তিনি বলেন, ‘এই রণতরী (আব্রাহাম লিংকন) মোতায়েনের সময় আমরা উভয় বিষয়ই লক্ষ্য করেছি: কাজও ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে এবং আমাদের নেতারা তাদের অধীনস্ত কর্মীদের যত্নও নিচ্ছেন।’
এর আগে রণতরীটিতে রসদ সরবরাহের সংকট, কিছু নাবিকের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, পচা খাবার এবং ছত্রাক পড়া গোসলখানাসহ নানা শোচনীয় অবস্থার কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে কংগ্রেসে আব্রাহাম লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে তদন্তের দাবি ওঠে। এসব ঘটনার পরই কাওয়ের পক্ষ থেকে এই দীর্ঘ বিবৃতি দেওয়া হলো।
আব্রাহাম লিংকন প্রায় নয় মাস ধরে সাগরে অবস্থান করছে। এই দীর্ঘ সময়ে হাজার হাজার নাবিক ও মেরিন সেনা স্বাভাবিকভাবে বন্দরে বিরতি নেওয়া বা মাটিতে পা রাখার সুযোগ পাননি। রণতরীটি টানা ২৫০ দিনের বেশি তীরে না ভিড়ে সাগরে ছিল, যা আধুনিক সময়ে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর জন্য রেকর্ড।
মূলত পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে রণতরীটিকে সেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য মোতায়েন রাখা হয়। দীর্ঘ সময় সাগরে অবস্থানের পাশাপাশি রণতরীর ভেতরের বাসযোগ্য পরিবেশ নিয়েও নাবিকদের পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষোভ জানানো হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার সান ডিয়েগোতে মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রায় ২০০ নাবিকের পরিবারের সদস্য তাদের উদ্বেগের কথা জানান। ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, এক নারী জানান, তার স্বামী সেদিন তাকে বার্তা দিয়ে বলেছিলেন, তিনি পরদিন আর ঘুম থেকে বেঁচে উঠতে চান না।
আরেক নাবিকের স্ত্রী ‘নেভি টাইমস’-কে জানান, সমুদ্রে থাকার মেয়াদ বারবার বাড়তে থাকায় তার স্বামী একপর্যায়ে জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। অন্য একটি ঘটনায় এক নাবিক লাফ দেওয়ার চেষ্টা করলে তার সহকর্মী তাকে টেনে ডেকে ফিরিয়ে এনে রক্ষা করেন।
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো বলেন, আব্রাহাম লিংকনের নাবিক ও তাদের পরিবারের ওপর চাপ ‘সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়ছে’। পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন সিনেটররাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক সিনেটর বলেন, আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের রণতরী থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টার খবর পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, তার ‘ভয়ংকর সতর্কসংকেত’।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। প্রথমে রণতরীটির দক্ষিণ চীন সাগরে যাওয়ার কথা ছিল। পরে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর প্রেক্ষাপটে এটিকে পশ্চিম এশিয়ায় পাঠানো হয়। সূত্র: দ্য হিল
জ/উ