পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে নবনির্মিত সেফটিক ট্যাংকে সংস্কার ও সেন্টারিংয়ের কাজ করতে গিয়ে বাবুরাম দেবসিংহ (৪৫) নামে এক নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ট্যাংকের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসে অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ ও স্থানীয়রা। এ ঘটনায় বাড়ির মালিক ও হেড মিস্ত্রিসহ আটজনের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে মামলা হয়েছে।নিহত বাবুরাম দেবসিংহ দেবীগঞ্জ উপজেলার চিলাহাটি ইউনিয়নের বলরামপুর নিজধাম এলাকার বাসিন্দা।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাতে নিহতের কাকা বুদ্ধ চরণ দেবসিংহ বাদী হয়ে দেবীগঞ্জ থানায় মামলাটি করেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ১৩ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে দেবীগঞ্জের একটি বাড়িতে নবনির্মিত সেফটিক ট্যাংকের সংস্কারকাজের জন্য বাবুরামকে ডেকে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ঢাকনা দিয়ে বন্ধ থাকায় ট্যাংকের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস জমে থাকলেও কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়েই তাঁকে ভেতরে নামানো হয় বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, ট্যাংকের ভেতরে কাজ করার সময় বাবুরাম অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে আসামিরা সময়ক্ষেপণ করেন। পরে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে কোনো একসময় ট্যাংকের ভেতরেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে লাভলী বেগম, রানা সরকার ও মুজিবুল ইসলাম বাবুরামের মরদেহ সাইফুল ইসলামের অটোরিকশায় করে তাঁর বাড়ির আঙিনায় রেখে চলে যান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে পাঠায়।
মামলায় আসামিরা হলেন- শালডাঙ্গা ইউনিয়নের অমরখানা জামুড়ীতলি গ্রামের মৃত নসরুল ইসলামের ছেলে শালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. রাব্বি হোসেন, মো. বাবুল হোসেন ও মো. জুয়েল ইসলাম, তাঁর মেয়ে লাভলী বেগম, একই এলাকার কসিম উদ্দিনের ছেলে মুজিবুল ইসলাম, আলম ইসলামের ছেলে রানা সরকার, সাইফুল ইসলাম এবং টেপ্রিগঞ্জ ইউনিয়নের বলরামপুর গ্রামের ভোলানাথের ছেলে হেড মিস্ত্রি উত্তম রায়।
নিহতের কাকা ও মামলার বাদী বুদ্ধ চরণ দেবসিংহ বলেন, বাবুরাম সেফটিক ট্যাংকে নেমে অসুস্থ হওয়ার পরও তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলো না কেন? যথাসময়ে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলে তাঁর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো। আসামিদের অবহেলার কারণেই আমার ভাতিজার মৃত্যু হয়েছে।
তবে বাড়ির মালিক নবির হোসেন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আমি ঢাকায় থাকি। ঘটনার দিন মিস্ত্রি ও শ্রমিকরা মূলত বাড়ির জানালার কাজ করতে এসেছিলেন। সেফটিক ট্যাংকটিও প্রায় দেড় মাস আগে ওই মিস্ত্রিরাই নির্মাণ করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, জানালার কাজ শেষে হেড মিস্ত্রি উত্তম রায় শ্রমিকদের সেফটিক ট্যাংকের ভেতরে গিয়ে কাঠের সেন্টারিং খুলতে বলেন। তাঁর মা তখন বাড়িতে একা ছিলেন। শ্রমিকদের ডাকাডাকি শুনে তিনি এগিয়ে গিয়ে তাঁদের অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করেন।
মামলার প্রধান আসামি ইউপি সদস্য রাব্বি হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঘটনার সময় আমি চিলাহাটি ইউনিয়নের বালাপাড়া এলাকায় ছিলাম। আমার সহধর্মিণীর ফোন পেয়ে বাড়িতে গিয়ে দেখি, সেফটিক ট্যাংক থেকে শ্রমিকদের বের করা হয়েছে। বাড়িটি আমার ভাগিনার। সে ঢাকায় থাকে। ওই মিস্ত্রিরাই বাড়ির সব কাজ করেছেন। হেড মিস্ত্রির কথায় তারা নবনির্মিত সেফটিক ট্যাংকের ভেতরে ঢুকে সেন্টারিং খুলতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ঘটনার সময় সেখানে থাকা শ্রমিক ভাগ্য রায় বলেন, হেড মিস্ত্রির নির্দেশে বাবুরাম ও গৌতম সেফটিক ট্যাংকের ভেতরে সেন্টারিং খুলতে নামার পর অসুস্থ হয়ে যায়। তাঁদের উদ্ধারের জন্য আমি ভেতরে ঢুকলে শ্বাস নিতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যাই। পরে আমাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর আগে আমরা কেউই সেফটিক ট্যাংকের ভেতরে সেন্টারিংয়ের কাজ করিনি।
দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুসা মিঞা মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় আটজনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
জ/বা