ইউরোপীয় ফুটবলে গোলের রাজত্বটা যেন আবারও নিজের করে নিয়েছেন হ্যারি কেইন। ইংল্যান্ড ও বায়ার্ন মিউনিখের এই তারকা স্ট্রাইকার ২০২৫-২৬ মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে জিততে যাচ্ছেন মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন শু’ পুরস্কার। আগামী ১৯ আগস্ট বায়ার্নের এফসি বায়ার্ন মিউজিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে তুলে দেওয়া হবে এই পুরস্কার।
কেইনের জন্য এটি অবশ্য নতুন কোনো অর্জন নয়। এর আগে ২০২৩-২৪ মৌসুমেও ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ‘গোল্ডেন শু’ জিতেছিলেন তিনি। এবারও বুন্দেসলিগায় করেছেন ৩৬ গোল- দুই বছর আগের সেই সংখ্যাটিই আবার ছুঁয়েছেন। ফলে ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার দ্বিতীয়বারের মতো নিজের করে নিয়ে তিনি উঠে যাচ্ছেন আরও উঁচু এক তালিকায়। তার আগে মাত্র লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোই দুবারের বেশি এই পুরস্কার জিতেছেন।
তবে সংখ্যার বিচারে এবারের মৌসুম কেইনের জন্য আরও বিশেষ। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৬৫ ম্যাচে তার গোল ৭৩টি, সঙ্গে করেছেন ৮টি অ্যাসিস্ট। ২১ শতকে এক মৌসুমে গোল করার হিসাবে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কীর্তি। তার সামনে রয়েছে শুধু লিওনেল মেসির ২০১১-১২ মৌসুমের অবিশ্বাস্য ৯১ গোল।
কেইনের এই গোলবন্যার সবচেয়ে বড় সুফল পেয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ। জার্মান জায়ান্টদের সাফল্যের পথে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ইংলিশ অধিনায়ক। তার গোলের ওপর ভর করেই বায়ার্ন জিতেছে বুন্দেসলিগা, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার সুপারকাপ ও ডিএফবি কাপ। কাপ ফাইনালে তো রীতিমত হ্যাটট্রিক করেছেন কেইন। স্বাভাবিকভাবেই টুর্নামেন্টটির সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও উঠেছে তার হাতে।
বুন্দেসলিগায় টানা তৃতীয়বারের মতো সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। চ্যাম্পিয়নস লিগেও গোলের তালিকায় ছিলেন দ্বিতীয় স্থানে। সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে কেইনের পারফরম্যান্স তাকে শুধু বায়ার্নের সাফল্যের অন্যতম নায়কই করেনি, বরং বিশ্বের সেরা ফুটবলারের ব্যক্তিগত পুরস্কার ‘দ্য বেস্ট ফিফা মেনস প্লেয়ার’-এর অন্যতম দাবিদারও বানিয়েছে।
৩৩ বছর বয়সে এসে কেইনের ধারাবাহিকতা আরও বেশি বিস্ময় জাগায়। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের কোনো ক্লাবের হয়ে ১০০ গোলের মাইলফলকে পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও তিনি দ্রুততম খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েছেন। বয়স যেখানে অনেক স্ট্রাইকারের জন্য সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে কেইনের ক্ষেত্রে সেটিই যেন অভিজ্ঞতা, পরিণত সিদ্ধান্ত আর গোল করার ক্ষুধাকে আরও ধারালো করেছে।
জাতীয় দলের হয়েও এবার তার মৌসুম ছিল স্মরণীয়। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হিসেবে কেইন দলকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিয়ে গেছেন। পরে তারা হয়েছে তৃতীয়। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর ইংল্যান্ডের এটিই সেরা সাফল্য। ব্যক্তিগতভাবেও ইতিহাস গড়েছেন তিনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রিটিশ কোনো খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন কেইন, এবারের আসর শেষ করেছেন সাত গোল নিয়ে।
বায়ার্নের ইতিহাসেও কেইনের জায়গাটা ক্রমেই আলাদা হয়ে উঠছে। জার্মান ক্লাবটির হয়ে এর আগে ‘গোল্ডেন শু’ জিতেছেন কিংবদন্তি গার্ড মুলার ও রবার্ট লেওয়ারডস্কি। মুলার ১৯৭০ ও ১৯৭২ সালে এবং লেওয়ানডস্কি ২০২১ ও ২০২২ সালে এই পুরস্কার জিতেছিলেন। এবার তাদের পাশে নিজের নাম লেখাতে যাচ্ছেন কেইন- এবং তার দ্বিতীয় ‘গোল্ডেন শু’ সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও উজ্জ্বল করবে।
বায়ার্ন সভাপতি হার্বার্ট হাইনারের চোখে কেইন এখন ক্লাবের কিংবদন্তি স্ট্রাইকারদের উত্তরসূরি। তার মতে, গার্ড মুলার ও কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগের মতো গোল-শিকারিদের যে ঐতিহ্য বায়ার্নে ছিল, কেইন সেটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। শুধু গোল করার জন্য নয়, মাঠের বাইরে তার নেতৃত্ব, চরিত্র ও দলকে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতাও ক্লাবের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বায়ার্নের প্রধান নির্বাহী ইয়ান-ক্রিশ্চিয়ান ড্রেসেনও কেইনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তার মতে, কেইন মাঠে নামলেই গোটা বিশ্বের নজর চলে আসে বায়ার্নের দিকে। : তার আগমন ক্লাব ও বুন্দেসলিগাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একজন স্ট্রাইকার হয়েও ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়াটাই কেইনকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে বলে মনে করেন ড্রেসেন।
আর বায়ার্নের ক্রীড়া বিভাগের বোর্ড সদস্য ম্যাক্স এবার্লের চোখে কেইনের সবচেয়ে বড় গুণ শুধু গোল করা নয়। গোলের আড়ালে থাকা কাজগুলোতেই : তার আসল শ্রেষ্ঠত্ব। সতীর্থের অবস্থান বুঝে সময়মতো জায়গা তৈরি করা, নিখুঁত মুহূর্তে দৌড় শুরু করা, প্রতিপক্ষের রক্ষণকে নিজের উপস্থিতি দিয়ে ব্যস্ত রাখা—এসব সূক্ষ্ম কাজই কেইনের খেলাকে এত কার্যকর করে তোলে।
সেই কারণেই ‘গোল্ডেন শু’: তার কাছে কেবল ব্যক্তিগত পুরস্কার নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ স্ট্রাইকারের স্বীকৃতিও। গোল : তার কাজের শেষ ফলাফল; তার আগে থাকে বুদ্ধিমত্তা, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি, নিঃস্বার্থ পরিশ্রম এবং দলের প্রয়োজনে নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা।
কেইনের ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে তাই ‘গোল্ডেন শু’-এর দ্বিতীয় জয়টিকে শুধু আরেকটি ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল, বায়ার্নের একাধিক শিরোপা, ৭৩ গোলের অবিশ্বাস্য মৌসুম- সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমটি যেন : তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে পরিণত অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে থাকছে।
১৯ আগস্ট যখন ‘গোল্ডেন শু’ হাতে নেবেন কেইন, তখন সেটি শুধু ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার হবে না; বরং আধুনিক ফুটবলের এক পূর্ণাঙ্গ, পরিণত ও ধারাবাহিক গোলমেশিন হিসেবে : তার অবস্থানেরও আরেকটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হয়ে উঠবে।
জ/বা