আলেকজান্ডার অত্যন্ত বিরল একটি স্নায়বিক রোগ। প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে একজন মানুষের এই রোগ হয়ে থাকে। আলেকজান্ডার রোগটি ধীরে ধীরে স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে এবং প্রাণঘাতীও হতে পারে।
কয়েক দশক ধরে চলা গবেষণার ফল হিসেবে তৈরি জ্যানভাস্ট্রো ক্লিনিক্যাল ট্যায়ালে আশানুরূপ ফল দেখিয়েছে। ওষুধটি রোগীদের চলাফেরার সক্ষমতা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চলাচলের উন্নতিও দেখা গেছে।
সম্প্রতি এফডিএ (যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন) আলেকজান্ডার রোগের চিকিৎসায় সরাসরি কাজ করে এমন ওষুধের অনুমোদন দিয়েছে।
গবেষণায় কী মিলেছে
গবেষণায় দেখা গেছে জ্যানভাস্ট্রো গ্রহণকারী রোগীদের চলাফেরার সক্ষমতা সাধারণত স্থিতিশীল ছিল। এমনকি কিছু রোগীর চলাচলের ক্ষমতার উন্নতিও দেখা গেছে। এটি রোগের মূল জৈবিক প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য করে কাজ করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মেসিং বলেন, ‘আলেকজান্ডার রোগে আক্রান্ত রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য এটি একটি আনন্দের এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত দিন।’
বিরল ও ভয়াবহ মস্তিষ্কের রোগ
আলেকজান্ডার রোগে আক্রান্ত রোগীর পরিণতি গুরুতর হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর উপসর্গ দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং শরীরের অত্যাবশ্যকীয় কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে।
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খিঁচুনি হতে পারে। এছাড়া অর্জিত বিকাশগত দক্ষতা হারিয়ে যেতে পারে, হাঁটাচলা বা শরীর নাড়াচাড়া করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কথা বলা ও খাবার গিলতেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারও কারও মস্তিষ্কের ভেতরে বিপজ্জনকভাবে চাপ বেড়ে যায়।
রোগটির অগ্রগতি সবার ক্ষেত্রে একরকম হয় না। কারও ক্ষেত্রে শৈশবের শুরুতে, কারও ক্ষেত্রে কৈশোরে বা প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে প্রথম উপসর্গ দেখা দেয়। রোগটি কখন শুরু হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে উপসর্গের তীব্রতা এবং রোগের অগ্রগতির ধরন ভিন্ন হতে পারে।
কয়েক দশক ধরে চিকিৎসকেরা রোগীদের সহায়ক চিকিৎসা দিয়েছেন এবং নির্দিষ্ট উপসর্গ কমানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু রোগটির মূল কারণকে লক্ষ্য করে কাজ করতে পারে-এমন কোনো অনুমোদিত ওষুধ তাদের হাতে ছিল না।
জানা গেল রোগটির জিনগত কারণ
এই আবিষ্কারের সূত্রপাত অধ্যাপক মেসিং এবং আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়, বার্মিংহামের নিউরোবায়োলজির ইমেরিটাস অধ্যাপক মাইকেল ব্রেনারের গবেষণা থেকে। ১৯৯০ এর দশকের শেষ দিকে তাদের গবেষণায় আলেকজান্ডার রোগের জন্য দায়ী জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়। এর ফলে বিজ্ঞানীরা চিকিৎসা তৈরির জন্য একটি নির্দিষ্ট জৈবিক লক্ষ্য খুঁজে পান।
আবিষ্কারের সূচনা
আবিষ্কারটির সূচনা হয়েছিল গবেষণাগারের ইঁদুর নিয়ে কাজ করার সময় একটি অপ্রত্যাশিত ফলাফলের মাধ্যমে। মেসিং ও ব্রেনার জিনগতভাবে পরিবর্তিত কিছু ইঁদুর তৈরি করেছিলেন, যাদের শরীরে গ্লিয়াল ফাইব্রিলারি অ্যাসিডিক প্রোটিন নামের একটি প্রোটিন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি উৎপন্ন হচ্ছিল। এই প্রোটিন সাধারণত অ্যাস্ট্রোসাইট নামের বিশেষ কোষে পাওয়া যায়। মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জুর স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে এই কোষগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গবেষকেরা বিস্মিত হয়ে দেখেন, পরিবর্তিত ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক প্রোটিনের স্তূপ তৈরি হয়েছে। এই অস্বাভাবিক প্রোটিনের স্তূপকে বলা হয় রোজেনথাল ফাইবার যা আলেকজান্ডার রোগের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।
স্তূপগুলো অ্যাস্ট্রোসাইটের ভেতরে জমা হয়েছিল এবং মানুষের আলেকজান্ডার রোগে দেখা যাওয়া বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অস্বাভাবিকতার সঙ্গে এর মিল ছিল।
মেসিং বলেন, ‘আমরা আসলে তা করার উদ্দেশ্য ছাড়াই এমন একটি ইঁদুর তৈরি করে ফেলেছিলাম, যার শরীরে আলেকজান্ডার রোগের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ক্ষত তৈরি হয়েছিল।’
পরবর্তী সময়ে এই রোগে আক্রান্ত মানুষের ওপর আরও জিনগত গবেষণা চালিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, GFAP প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা দেয় যে জিন, তাতে মিউটেশন বা জিনগত পরিবর্তনই এই রোগের মূল কারণ।
রোগটির জিনগত কারণ শনাক্ত হওয়ায় এর নির্ণয় করাও অনেক সহজ হয়ে যায়। আগে মস্তিষ্কের টিস্যুতে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করার জন্য কখনো কখনো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করতে হতো। কিন্তু এখন রক্তের নমুনা থেকে জিনগত পরীক্ষা করেই রোগটির সঙ্গে সম্পর্কিত মিউটেশন শনাক্ত করা সম্ভব।
পরীক্ষার ফলাফল আশার আলো দেখায়
মেসিং ও তার সহকর্মীদের কাছে এই অনুমোদন তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা গবেষণার চূড়ান্ত সাফল্য। মস্তিষ্কের কোষের জীববিজ্ঞান নিয়ে মৌলিক গবেষণার মধ্য দিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী একটি ওষুধ উদ্ভাবনে ভূমিকা রাখে।
জিনগতভাবে পরিবর্তিত ইঁদুরের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে পাওয়া একটি অপ্রত্যাশিত ফলাফল থেকে শুরু করে অত্যন্ত বিরল একটি রোগের কারণ শনাক্ত করা, রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা এবং ওষুধ তৈরির ভিত্তি গড়ে তোলা-পুরো প্রক্রিয়াটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মেসিং বলেন, ‘এই দীর্ঘ যাত্রায় আলেকজান্ডার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গবেষণায় সহায়তা দেওয়া এবং বিভিন্ন গবেষণায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তারা এই অগ্রগতিতে অবদান রেখেছেন।’
জ/উ