দুর্গাপূজার সাজে এখন স্বাচ্ছন্দ্য, আভিজাত্য ও পরিবেশবান্ধব পোশাকের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ফ্যাশনে প্রাধান্য পাচ্ছে সহজ, মার্জিত ও বারবার পরার উপযোগী পোশাক। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে আরামদায়ক পোশাকের পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে নিজস্ব স্টাইলও।
এবারের পূজার সাজে এমনই ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছেন কলকাতার উদীয়মান ফ্যাশন ডিজাইনার অভিষেক নাইয়া। তার নতুন সংগ্রহ ‘শারদ অর্পণ’-এ বাংলার ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্পের সঙ্গে প্রাকৃতিক তন্তু ও সমকালীন নকশার সমন্বয় ঘটেছে। সংগ্রহটির চারটি বিশেষ সাজে মডেল হয়েছেন অভিনেত্রী জয়া আহসান।
বাংলার প্রকৃতি, উৎসবের আবহ ও সমৃদ্ধ বস্ত্র-ঐতিহ্য এই সংগ্রহের মূল অনুপ্রেরণা। শরতের বদলে যাওয়া দৃশ্যপট, ফুলের রং, পরিচিত গন্ধ এবং বাংলার প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ ফুটে উঠেছে পোশাকের নকশায়।
অবিষেক বলেন, ‘এই সংগ্রহে বস্ত্র ও ফ্যাশনের ভাষায় বাংলার নানা অনুভূতিকে একসঙ্গে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। রং নেওয়া হয়েছে বাংলার উৎসবের আবহ ও প্রকৃতি থেকে। নকশায় রয়েছে বাংলার উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের নানা উপাদান। গাঁদা, রজনীগন্ধা, শিউলি ও পদ্মফুলের পাশাপাশি পেঁপেগাছ এবং রাজকীয় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারও আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। প্রতিটি মোটিফের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক সংযোগ রয়েছে।’
প্রকৃতির ছোঁয়ায় ফ্যাশন
টেকসই ফ্যাশন অবিষেকের নকশার অন্যতম ভিত্তি। ‘শারদ অর্পণ’ সংগ্রহে তিনি ব্যবহার করেছেন প্রাকৃতিক কাপড় ও সুতা। প্রাকৃতিক রেশম থেকে আনারসের তন্তু দিয়ে তৈরি সুতা, বিভিন্ন উপকরণই সংগ্রহটির নকশায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। হাতে বোনা কাপড়ের মাধ্যমে পোশাকের সঙ্গে কারিগরদের শ্রম ও দক্ষতার সম্পর্কও তুলে ধরেছেন তিনি।
সংগ্রহের প্রতিটি শাড়ি যেন আলাদা একটি গল্প বলে। কোথাও ফুল, কোথাও প্রকৃতির দৃশ্য, আবার কোথাও প্রাণী, ঋতু, আচার কিংবা স্মৃতির ছাপ। সব মিলিয়ে বাংলার প্রকৃতি, উৎসব, রং, কারুশিল্পী এবং বস্ত্র-ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনই ‘শারদ অর্পণ’-এর মূল ভাবনা।
ফুলের কোমলতা, প্রাণীর শক্তি
উৎসবের পোশাকে ফুলের নকশা পরিচিত হলেও অবিষেক সেই চেনা ধারার বাইরে যেতে চেয়েছেন। তার মতে, বাংলার প্রকৃতিতে কোমলতা ও শক্তি পাশাপাশি অবস্থান করে। শিউলি ফুলের মতো স্নিগ্ধ অনুষঙ্গের সঙ্গে একই ভূখণ্ডে রয়েছে শক্তিশালী বন্য প্রাণীও।
এই বৈপরীত্যই সংগ্রহটির নকশায় বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।ফুলের নকশা তৈরি করেছে কাব্যিক আবহ, আর প্রাণিজগতের অনুষঙ্গ এনেছে শক্তি ও নাটকীয়তা। ফলে পোশাকগুলোয় বাংলার পরিচিত ঐতিহ্য থাকলেও সেগুলো অতীতনির্ভর বা গতানুগতিক হয়ে ওঠেনি।
স্মৃতিকে নতুনভাবে পরার গল্প
শরৎ এলেই ফিরে আসে শিউলি ফুলের গন্ধ, ঢাকের শব্দ, উৎসবের আবহ আর পূজার অপেক্ষা। প্রতি বছর একই পরিচিত অনুষঙ্গ ফিরে এলেও অনুভূতিতে থাকে নতুনত্ব। অবিষেকের মতে, পোশাকের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।
একটি শাড়ি বারবার পরা যায়, তবে প্রতিবার একইভাবে পরতে হবে এমন নয়। শাড়ি পরার ধরন, সাজানোর কৌশল ও উপস্থাপনায় বদল এনে পরিচিত পোশাকেও নতুন পরিচয় দেওয়া সম্ভব।
আধুনিক জীবনযাত্রায় পশ্চিমা পোশাকের ব্যবহার বাড়লেও দুর্গাপূজা বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। পূজার আচার, খাবার, গান, আবেগ ও পোশাকের মধ্য দিয়ে সেই সংযোগ আরও গভীর হয় বলে মনে করেন এই ডিজাইনার।
গরম-বৃষ্টিতে কেমন হবে পূজার সাজ
পূজার সময় গরম ও বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে পোশাক বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অবিষেক। তার মতে, ফ্যাশন এমন হওয়া উচিত, যা আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি উৎসব উপভোগের স্বাচ্ছন্দ্যও নিশ্চিত করে।
তিনি অতিরিক্ত গাঢ় রং এবং সিনথেটিক বা প্লাস্টিকভিত্তিক উপকরণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। তুলা, লিনেন ও খাঁটি রেশমের মতো প্রাকৃতিক তন্তু তুলনামূলকভাবে বাতাস চলাচলে সহায়ক এবং আরামদায়ক।
সকালের সাজে হালকা রঙের তুলা বা লিনেন ভালো মানাতে পারে। সন্ধ্যার আয়োজনে বেছে নেওয়া যেতে পারে হালকা রেশমের শাড়ি, সঙ্গে একটু গাঢ় বা সমৃদ্ধ রঙের ব্যবহার।
উৎসবের সাজে নজর কাড়তে ভারী পোশাকের প্রয়োজন নেই বলেও মনে করেন অবিষেক। কাপড়ের ধরন, রং, শাড়ি পরার ভঙ্গি এবং নিজেকে উপস্থাপনের কৌশলেই তৈরি হতে পারে আকর্ষণীয় লুক। তার পরামর্শ, সাজ হোক মার্জিত, আরামদায়ক এবং নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই। সূত্র: ইনডাল্জ এক্সপ্রেস
জ/উ