অবহেলার বাঁশেই জলবায়ু রক্ষার নতুন পথ দেখাচ্ছে জাপান

ফিচার ডেস্ক

ফিচার

2026-09-19T15:30:40+06:00
2026-09-19T15:30:40+06:00
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইপেপার  বাংলা English
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
ফিচার
অবহেলার বাঁশেই জলবায়ু রক্ষার নতুন পথ দেখাচ্ছে জাপান
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৩০ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
বাঁশ এশিয়ার অন্যতম পরিচিত প্রাকৃতিক সম্পদ। একসময় জাপানেও দৈনন্দিন গৃহস্থালি সামগ্রী থেকে ঘরবাড়ি নির্মাণ, এমনকি খাবার হিসেবেও বাঁশের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রার বিস্তার, প্লাস্টিকের মতো বিকল্প উপকরণের সহজলভ্যতা এবং কম দামে আমদানি করা বাঁশজাত পণ্যের কারণে দেশটিতে স্থানীয় বাঁশের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমে যায়। এর ফলে অযত্নে পড়ে থাকে জাপানের বিস্তীর্ণ বাঁশবাগান।

তবে সেই অব্যবহৃত বাঁশই এখন জাপানে কার্বন নিঃসরণ কমানো, জলবায়ু সুরক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

বাঁশ দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং এর জন্য খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু দীর্ঘদিন সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় এই দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদই একসময় জাপানে বড় ধরনের সমস্যার কারণ হয়ে ওঠে। দেশটির বন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে জাপানে বাঁশবাগানের আয়তন ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার হেক্টর। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার হেক্টরে। আয়তনের বিশালতা বোঝাতে বলা যায়, এই পরিমাণ জমি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের মোট আয়তনের দ্বিগুণেরও বেশি।

গ্রামাঞ্চলে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জনবসতি কমে যাওয়ায় বাঁশবাগানের বড় একটি অংশ অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এর একটি উদাহরণ পাওয়া যায় নাগানো প্রদেশের একটি গ্রামে। ১৯৭৭ সালে সেখানে বাঁশবাগানের আয়তন ছিল মাত্র ০.২৬ হেক্টর। গ্রামটি বসতিহীন হওয়ার পর ২০১৪ সালে সেই আয়তন বেড়ে দাঁড়ায় ৩.৫২ হেক্টরে, অর্থাৎ সাড়ে ১৩ গুণেরও বেশি।

নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়া এসব বাঁশবাগান শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি তৈরি করছে না, একই সঙ্গে ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জাপানের কয়েকটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ অব্যবহৃত বাঁশকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সম্পদে রূপ দেওয়ার নতুন পথ তৈরি করেছে।

এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ফুকুওকা প্রদেশের নিপ্পন কানরিউ ইন্ডাস্ট্রির তৈরি ‘কাগুয়া রোড’ নামের বিশেষ সড়ক নির্মাণ উপকরণ। জাপানি রূপকথার একটি চরিত্রের নামে নামকরণ করা এ উপকরণ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় বাঁশের আঁশ, আগ্নেয়গিরির ছাই, ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড ও পাহাড়ি বালু।

প্রচণ্ড গরমে সাধারণ পিচঢালা সড়কের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা যেখানে প্রায় ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়, সেখানে ‘কাগুয়া রোড’-এর তাপমাত্রা অন্তত ১৫ ডিগ্রি কম থাকে। একই সঙ্গে বাঁশের আঁশ মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতেও সহায়তা করে। পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছে। আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে উৎপাদন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করেছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিটি।

বাঁশের আরেকটি ব্যবহার দেখা যাচ্ছে মিয়াজাকি প্রদেশে। সেখানে ইয়ামাতো ফ্রন্টিয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিনামূল্যে অরক্ষিত বাঁশবাগান কেটে পরিষ্কার করছে। পরে সংগৃহীত বাঁশ প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হচ্ছে ‘সাসা সাইলেজ’ নামের বিশেষ পশুখাদ্য ও সার।

বাঁশ গুঁড়া করে চিটাগুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই খাবার। এতে থাকা প্রচুর ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া গবাদিপশুর হজমশক্তি ও অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। খামারিদের ভাষ্য, এই খাবার ব্যবহারে গরু ও ছাগলের দুধ ও মাংস উৎপাদন বেড়েছে এবং মাংসের মানও উন্নত হয়েছে। একইভাবে সার হিসেবে ব্যবহার করলে ধান ও সবজির ফলনও বহুগুণ বেড়েছে।

জাপান বর্তমানে গবাদিপশুর খাদ্যের মাত্র ২০ শতাংশ নিজ দেশে উৎপাদন করতে পারে। বাকি অংশের জন্য দেশটিকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ‘সাসা সাইলেজ’ একদিকে পশুখাদ্য আমদানির ব্যয় ও কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে সহায়তা করছে, অন্যদিকে অরক্ষিত বাঁশবাগানের ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করছে।

বাঁশের এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে স্থানীয় সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও উদ্যোগী হয়েছে। কোচি প্রদেশে সম্প্রতি বাঁশের বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। অন্যদিকে ওইতা প্রদেশ বনভূমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বাঁশ কাটা এবং চলাচলের রাস্তা তৈরিতে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে।

এ ছাড়া কোবে শহরের প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় ও নাগরিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে আগাছা দমনে বাঁশের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার, ব্যবসায়ী, গবেষক ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে বাঁশ তাই ধীরে ধীরে আঞ্চলিক সমস্যা থেকে মূল্যবান জাতীয় সম্পদে পরিণত হচ্ছে।

প্রাকৃতিক সম্পদকে ফেলে রাখা বা ধ্বংস না করে কীভাবে চক্রাকার অর্থনীতি বা সার্কুলার ইকোনমির মাধ্যমে নতুন বাজার তৈরি করা যায়, জাপানের উদ্যোগগুলো তার একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সাম্প্রতিক শ্বেতপত্র ‘দ্য ফিউচার অব ম্যাটেরিয়ালস সিস্টেমস’-এ বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি ব্যবসায়ী নেতা।

জাপানের এই উদ্যোগ অন্য দেশগুলোর জন্যও অনুসরণযোগ্য একটি মডেল হতে পারে। অব্যবহৃত প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ সুরক্ষা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হলে একই সঙ্গে প্রকৃতি ও মানুষের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনা সম্ভব। তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম

জ/উ






Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]