একটি ভিডিও। তারপর বিয়ে প্রকাশ। দলীয় তদন্ত। বহিষ্কার। সংসদ সদস্য পদ নিয়ে প্রশ্ন। আর সবশেষে রাজধানীর ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে দ্বিতীয় স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের জীবনে ঘটনাপ্রবাহ যেন একের পর এক মোড় নিয়েছে। এবার সেই মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় পুলিশের রিমান্ডে গাজী নজরুল।
আজ সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত গাজী নজরুলের চার দিন এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। পুলিশ তাঁদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিল। তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, মৃত্যুর সময় আসামিরা একই বাসায় ছিলেন। মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ বা ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল কি না, তা জানতে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
যে ঘরে ঝুলছিল মরিয়ম :
গত ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল। ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে ছিলেন ১৯ বছরের মরিয়ম খাতুন, সেখানেই পাওয়া গেল তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহকে দ্রæত বাসায় আসতে বলেন। তিনি গিয়ে দেখতে পান, মেয়ের মরদেহ ঘরের ভেতর ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে ঝুলছে। পরে পুলিশের সহায়তায় দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বিছানার ওপর একটি কথিত আত্মহত্যার নোট পাওয়ার কথাও এজাহারে বলা হয়েছে। সেখানে বিশ্বাসভঙ্গ ও কাছের মানুষের কারণে হতাশ হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে বলে বাদী দাবি করেছেন। তবে নোটটি মরিয়মের নিজের লেখা কি না, তা ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
অভিযোগে দাম্পত্য নির্যাতনের চিত্র : মরিয়মের বাবার করা মামলায় গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, জুনে বিয়ের পর থেকেই মরিয়মকে বিভিন্ন বিষয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। পরিবারের সদস্যদের কাছে মুঠোফোনে তিনি এসব অভিযোগ করেছিলেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং আত্মহত্যার পেছনে কারও প্ররোচনা বা অন্য কোনো ভ‚মিকা ছিল কি না, তা তদন্তেই নির্ধারিত হবে।
ভিডিও, বিয়ে, বহিষ্কার-তারপর মৃত্যু :
ঘটনার শুরু গত জুলাইয়ে। গাজী নজরুল ও মরিয়মের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে দাবি করা হলেও পরে গাজী নজরুল জানান, ওই তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। তিনি জানান, ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মরিয়মকে বিয়ে করেছেন।
এরপর ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়েছে বলে জানায় দলটি। নির্বাচন কমিশনকেও বিষয়টি জানানো হয়। এর মধ্যেই ভিডিও প্রকাশের ঘটনায় গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমান। ওই মামলায় ১০ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে আট সপ্তাহের জামিন পান গাজী নজরুল। এখন সেই ওবায়দুরই মরিয়মের মৃত্যুর মামলার আসামি।
এখন তদন্তের মুখোমুখি তিন প্রশ্ন :
ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল? মরিয়মকে কেউ মানসিক চাপে রেখেছিল কি না? কথিত আত্মহত্যার নোটটি তাঁর নিজের লেখা কি না?
এই তিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন পুলিশের রিমান্ডে গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী। মাত্র দুই মাস আগে যে ঘটনা শুরু হয়েছিল একটি ভিডিও দিয়ে, সেটিই এখন গড়িয়েছে একটি তরুণীর মৃত্যু, ফৌজদারি মামলা এবং সংসদ সদস্যের পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে। তদন্তই বলবে-মরিয়মের মৃত্যুর নেপথ্যে আসলে কী ছিল।
জ/বা