খুলনা মেডিকেল কলেজের সামনে ৯০ বছরের হাবিব ফকির দম্পতির নিঃশব্দ বেঁচে থাকার লড়াই

খুলনা, প্রতিনিধি

দেশজুড়ে

2026-09-14T15:02:03+06:00
2026-09-14T15:02:03+06:00
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইপেপার  বাংলা English
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
দেশজুড়ে
খুলনা মেডিকেল কলেজের সামনে ৯০ বছরের হাবিব ফকির দম্পতির নিঃশব্দ বেঁচে থাকার লড়াই
খুলনা, প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:০২ পিএম 
খুলনা মেডিকেল কলেজের সামনে ৯০ বছরের হাবিব ফকির দম্পতির নিঃশব্দ বেঁচে থাকার লড়াই
জীবনের শেষ প্রহরে এসে কারও ভরসা হওয়ার কথা সন্তান, স্বজন কিংবা একটি নিরাপদ ঘর। অথচ ৯০ বছরের মো. হাবিব ফকিরের জীবনে সেই ভরসার জায়গাটি দখল করে নিয়েছে একটি ছোট্ট চায়ের কেটলি। খুলনা মেডিকেল কলেজের সামনে প্রতিদিন বসে সেই কেটলিতে চা ফুটান হাবিব ফকির ও তাঁর স্ত্রী জোহরা বেগম। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, অসুস্থতা আর অভাব-সবকিছুকে সঙ্গে নিয়েই চলছে তাঁদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

পিরোজপুর জেলার কাতুল্লে গ্রামের এই বৃদ্ধ দম্পতির চোখে এখন আর বড় কোনো স্বপ্ন নেই। নেই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রত্যাশাও। তাঁদের চাওয়া খুব সামান্য-দু’বেলা খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ আর মাথা গোঁজার মতো একটু নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সেই সামান্যটুকুও যেন তাঁদের কাছে আজ বড় কঠিন।
কিডনির জটিল রোগে আক্রান্ত হাবিব ফকির। অসুস্থতার কারণে প্রায়ই বিছানায় পড়ে থাকতে হয় তাঁকে। সকাল হলেই তাঁর সামনে নতুন এক দুশ্চিন্তা—আজকের ওষুধের টাকা কোথা থেকে আসবে? খাবারই বা জুটবে কীভাবে? তারপরও জীবন থেমে থাকে না।

বৃদ্ধ শরীরটাকে কোনোভাবে সামলে আবারও চায়ের দোকানের সামনে বসেন তিনি। পাশে থাকেন স্ত্রী জোহরা বেগম। একসময় যে হাতগুলো সংসার চালানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছে, আজ সেই হাতই কাঁপতে কাঁপতে চায়ের কাপ এগিয়ে দেয় পথচারীদের। যৌবনে পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন হাবিব ফকির। পিরোজপুরের কাতুল্লে গ্রাম থেকে জীবিকার সন্ধানে খুলনায় এসেছিলেন। নিজের শ্রম আর সততাকে পুঁজি করেই ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ জীবনের সেই পরিশ্রম তাঁকে শেষ পর্যন্ত এনে দাঁড় করিয়েছে নিঃস্বতার কিনারায়।

স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘আসমানী’ নামেও পরিচিত। তাঁদের ভাষায়, হাবিব চাচা ছিলেন একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ। জীবনের প্রতিটি দিন তিনি লড়াই করে কাটিয়েছেন। বয়স তাঁকে থামিয়ে দিতে চাইলেও অভাব তাঁকে থামতে দেয়নি। স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, “হাবিব চাচা ও জোহরা খালা দিন-রাত চা বিক্রি করেই সংসার চালান। বয়সের কারণে এখন কাজ করতেও অনেক কষ্ট হয়। তবুও তাঁরা কারও কাছে হাত পাততে চান না।”

চার মেয়ের মধ্যে একমাত্র নাছিমা বাবা-মায়ের পাশে থাকার চেষ্টা করেন। রান্না করেন, দেখাশোনা করেন, অসুস্থ বাবার সেবা করেন। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব, ততটুকুই করেন তিনি। কিন্তু অসুস্থতা, ওষুধের খরচ আর নিত্যদিনের প্রয়োজন-সব মিলিয়ে এই পরিবারটির জীবন যেন প্রতিদিনই নতুন এক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। হাবিব ফকিরের কণ্ঠে তাই এখন বড় কোনো দাবি নেই। সরকারের কাছে তাঁর আকুতি-“একটু জায়গা, একটু ঘর, একটু সহযোগিতা।” মাত্র কয়েকটি শব্দ। অথচ সেই শব্দগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে ৯০ বছরের একটি জীবনের অসহায়ত্ব।

স্থানীয়রা ইতোমধ্যে বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আনার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, দ্রুত এই বৃদ্ধ দম্পতির জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিদিন খুলনা মেডিকেল কলেজের সামনে দিয়ে অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন। তাঁদের অনেকেই হয়তো দেখেন—এক পাশে ছোট্ট চায়ের দোকান, ফুটছে চা, কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন মানুষ। কিন্তু সেই চায়ের ধোঁয়ার আড়ালে যে দু’টি ক্লান্ত মুখ প্রতিদিন জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছে, সেই গল্পটি হয়তো সবার চোখে পড়ে না।

হাবিব ফকিরের শরীর আজ আর আগের মতো শক্তিশালী নয়। জোহরা বেগমের চোখেও জমেছে দীর্ঘ জীবনের ক্লান্তি। তবুও তাঁদের আত্মসম্মান এখনও বেঁচে আছে। তাঁরা ভিক্ষা চান না। চান না করুণা। তাঁরা চান শুধু একটু নিরাপদ আশ্রয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা আর শেষ বয়সটুকু সম্মানের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ। একসময় যে মানুষটি নিজের শ্রম দিয়ে অন্যের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়েছেন, আজ তাঁর নিজের হাতেই প্রয়োজন সহায়তার হাত।

হাবিব ফকির ও জোহরা বেগমের গল্প তাই শুধু একটি অসহায় বৃদ্ধ দম্পতির গল্প নয়। এটি আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নীরব মানুষের গল্প- যাঁরা কষ্ট পান, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারেন না, যাঁদের প্রয়োজন আছে, কিন্তু হাত পাততে লজ্জা হয়, যাঁরা সাহায্যের অপেক্ষায় থাকেন, অথচ সমাজের ব্যস্ততার ভিড়ে অদৃশ্য হয়ে যান। ৯০ বছরের একটি জীবন যখন শেষ প্রহরে এসে একটি চায়ের কেটলির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন প্রশ্ন শুধু তাঁদের জীবনের নয়- প্রশ্ন আমাদের মানবিকতারও।

হয়তো হাবিব ফকিরের জীবনের সব কষ্ট আমরা মুছে দিতে পারব না। কিন্তু তাঁর শেষ দিনগুলো একটু স্বস্তির হতে পারে। জোহরা বেগমের চোখের জল কিছুটা কমতে পারে। তাঁদের মাথার ওপর উঠতে পারে একটি নিরাপদ ছাদ। কারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সহায়তা সবসময় অর্থ নয়- কখনো কখনো সময়মতো বাড়িয়ে দেওয়া একটি হাতও একজন মানুষের পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারে।

চায়ের কেটলির ধোঁয়ার আড়ালে হারিয়ে যেতে বসা এই দুই প্রবীণের আর্তনাদ কি আমাদের হৃদয়ে পৌঁছাবে? এখন সেই উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।





Advertisement
Loading...
Loading...
দেশজুড়ে - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]