মুসলিম দেশে আইন প্রণয়নে কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ

ধর্ম ডেস্ক

ইসলাম ও জীবন

2026-09-12T12:33:16+06:00
2026-09-12T12:33:16+06:00
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইপেপার  বাংলা English
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
ইসলাম ও জীবন
মুসলিম দেশে আইন প্রণয়নে কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
একটি রাষ্ট্রের আইন মানুষের জীবন, সম্পদ, পরিবার, অধিকার, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার গুরুত্ব কতটা-এ প্রশ্নটি তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামের দৃষ্টিতে আইন কেবল অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের বিষয় নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার সংরক্ষণ, আমানত রক্ষা এবং জুলুম প্রতিরোধও এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

কোরআন-সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ

কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার দিকে ফিরে যাওয়ার কথা পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল তাদেরও। অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ হলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হও। এটাই উত্তম এবং পরিণামের দিক থেকে সর্বোত্তম।’ (সুরা নিসা: ৫৯)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তাদের পারস্পরিক বিরোধের ক্ষেত্রে তারা আপনাকে বিচারক মানে, এরপর আপনার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনো সংকোচ না রাখে এবং পূর্ণভাবে মেনে নেয়।’ (সুরা নিসা: ৬৫)

এসব আয়াতের আলোকে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশনাকে একজন মুসলিমের জন্য চূড়ান্ত নীতিগত মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কোরআনের নির্দেশনা শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়

কোরআনকে শুধু নামাজ, রোজা কিংবা ব্যক্তিগত ইবাদতের নির্দেশনার গ্রন্থ হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ও নৈতিক নির্দেশনার একটি বড় অংশ উপেক্ষিত থেকে যায়। বিচার, আমানত, পরিবার, সম্পদ, উত্তরাধিকার, চুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কোরআনে নির্দেশনা রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করতে।’ (সুরা নিসা: ৫৮)

আরও বলা হয়েছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার না করার জন্য প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার করো, এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়েদা: ৮)

অর্থাৎ ইসলামি দৃষ্টিতে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে শুধু বিধান নির্ধারণই নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার সংরক্ষণ এবং জুলুম প্রতিরোধের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

যেসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে

ইসলামি শরিয়তে কিছু বিষয়ে কোরআন-সুন্নাহয় সরাসরি ও সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাধিকার, বিবাহ ও তালাকের নির্দিষ্ট বিধান, সুদ, মদ, ব্যভিচার, চুরি, মিথ্যা সাক্ষ্য, জুলুম, মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ এবং আমানতের খেয়ানত উল্লেখযোগ্য।

এসব বিষয়ে একজন মুসলিমের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ বিপরীত কোনো বিধানকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী তাদের মধ্যে বিচার করো এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।’ (সুরা মায়েদা: ৪৯)

তবে কোনো একটি আয়াত বা হাদিসকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করে বিধান নির্ধারণ করা ইসলামি আইনশাস্ত্রের পদ্ধতি নয়। সংশ্লিষ্ট সব দলিল, শরিয়তের সামগ্রিক নীতি এবং যোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যা বিবেচনায় নিয়েই এসব বিধান বোঝা ও প্রয়োগ করার কথা বলা হয়েছে।

নতুন বিষয়ে রয়েছে ইজতিহাদের সুযোগ

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রশাসন, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্যসহ অসংখ্য নতুন বিষয় রয়েছে, যেগুলোর বিস্তারিত বিধান কোরআন-হাদিসে সরাসরি উল্লেখ নেই। এসব ক্ষেত্রে ইসলামি আইনশাস্ত্রে ইজতিহাদ, কিয়াস, ইজমা, মাসলাহা এবং প্রচলিত রীতিনীতির মতো স্বীকৃত পদ্ধতির মাধ্যমে বিধান নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে।

তবে এর শর্ত হলো, নির্ধারিত বিধান কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং শরিয়তের মৌলিক নীতির বিরোধী হতে পারবে না।

ইসলামের ইতিহাসে ফকিহ ও আলেমরা পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও নতুন বাস্তবতার আলোকে গবেষণা এবং ইজতিহাদের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে বিধান নির্ধারণ করেছেন। বিভিন্ন মাজহাব ও ফিকহি ধারায় কিছু বিষয়ে মতপার্থক্যও দেখা গেছে।

অর্থাৎ কোরআন-সুন্নাহকে আইনের মূল নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করার অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রশাসনিক বিধান সরাসরি কোনো আয়াত বা হাদিস থেকে উদ্ধৃত করতে হবে। যেখানে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে, সেখানে তা মান্য করা জরুরি। আর যেখানে নির্দিষ্ট বিধান নেই, সেখানে শরিয়তের স্বীকৃত নীতির আলোকে যোগ্য ব্যক্তিদের গবেষণা ও ইজতিহাদের সুযোগ রয়েছে।

আইন মূল্যায়নে ন্যায়বিচারও গুরুত্বপূর্ণ

ইসলামে রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচারব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং জুলুম প্রতিরোধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।’ (সুরা নাহল: ৯০)

তাই কোনো আইন শুধু মুসলিম দেশের আইন-এই পরিচয় বহন করলেই সেটি ইসলামি আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে না। আইনটি বাস্তবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করছে কি না, দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষা করছে কি না এবং কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনার বিপরীতে যাচ্ছে কি না-এসব বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে।

একইভাবে শুধু কোনো আইনের নাম বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সেটিকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দেওয়াও যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট আইনের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, বাস্তব প্রয়োগ এবং এ বিষয়ে যোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

কোরআন-সুন্নাহ মানা শুধু দণ্ডবিধিতে সীমাবদ্ধ নয়

কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণকে শুধু কয়েকটি দণ্ডবিধি বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। একজন শাসক ও আইনপ্রণেতার জন্য সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দুর্নীতি প্রতিরোধ, দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জুলুম থেকে বিরত থাকাও ইসলামি দায়িত্বের অংশ।

এমনকি কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিরূপ মনোভাব থাকলেও তাদের ব্যাপারে ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না হওয়ার নির্দেশ রয়েছে কোরআনে। (সুরা মায়েদা: ৮)

অর্থাৎ ক্ষমতাবান ও দুর্বল, সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু-সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও ইসলামি আইন ও শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

সব মিলিয়ে মুসলিম দেশে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করা একজন মুসলিমের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত। একই সঙ্গে নতুন ও পরিবর্তনশীল বিষয়ে শরিয়তের মৌলিক নীতি, জনকল্যাণ এবং যোগ্য আলেমদের ইজতিহাদকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে কোনো আইনের ইসলামি মূল্যায়নে শুধু নাম বা পরিচয়ের দিকে না তাকিয়ে আল্লাহর নির্দেশনার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়গুলোকে মূল বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। সূত্র: সুরা নিসা: ৫৮, ৫৯, ৬৫; সুরা মায়েদা: ৮, ৪৯; সুরা নাহল: ৯০।

জ/উ






Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম ও জীবন - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]