ধর্ম ডেস্ক

ইসলাম ও জীবন

2026-08-29T08:15:29+06:00
2026-08-29T08:15:29+06:00
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
বাংলা English
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
Advertisement
ইসলাম ও জীবন
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্যের আদর্শ রাসুলুল্লাহ (সা.)
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৮:১৫ এএম 
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ভারসাম্যপূর্ণ জীবনাচরণের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। ইবাদত, পারিবারিক জীবন, নেতৃত্ব, মানুষের সঙ্গে আচরণ কিংবা দুঃখ-আনন্দ—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, কোনো একটি অধিকার বা দায়িত্ব পালনের জন্য অন্য কোনো বৈধ অধিকার উপেক্ষা করা উচিত নয়।

ইবাদত ও পার্থিব জীবনের সমন্বয়

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবাদতে ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠদের একজন। তবে তিনি দ্বিনকে মানুষের জন্য অসহনীয় করে তোলেননি। বরং সহজতা ও রহমতের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এই দ্বিন সহজ। আর যে ব্যক্তি দ্বিনের ব্যাপারে অতিরিক্ত কঠোরতা অবলম্বন করবে, দ্বিন তাকে পরাভূত করবে। অতএব, তোমরা সঠিক পথে থাকো, সাধ্যের কাছাকাছি থাকো, সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং সহজ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৯)

তিন ব্যক্তি তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জানতে এসে নিজেদের আমলকে কম মনে করে একজন সারাবছর রোজা রাখা, অন্যজন সারা রাত নামাজ পড়া এবং তৃতীয়জন বিয়ে না করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি এবং সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। কিন্তু আমি রোজা রাখি এবং রোজা ছাড়িও; নামাজ পড়ি এবং ঘুমাই; আর আমি নারীদের বিয়ে করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত থেকে বিমুখ হয়, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৬৩)

অর্থাৎ, ইবাদত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা জীবনের অন্যান্য বৈধ দায়িত্ব ও অধিকার নষ্ট করে নয়।

আল্লাহ, নিজের ও মানুষের অধিকারের ভারসাম্য

সালমান ফারসি (রা.) ও আবু দারদা (রা.)-এর ঘটনাতেও ভারসাম্যের শিক্ষা রয়েছে। আবু দারদা (রা.) অতিরিক্ত ইবাদতে ব্যস্ত হয়ে নিজের শরীর ও পরিবারের অধিকার উপেক্ষা করছিলেন। তখন সালমান (রা.) তাঁকে বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার নিজের অধিকার আছে, তোমার রবেরও তোমার ওপর অধিকার আছে, তোমার অতিথিরও তোমার ওপর অধিকার আছে এবং তোমার পরিবারেরও তোমার ওপর অধিকার আছে। অতএব প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার দাও।’

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে তিনি বলেন, ‘সালমান সত্য বলেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৬৮)

এ শিক্ষা থেকে বোঝা যায়, একটি অধিকার পূরণ করতে গিয়ে অন্য অধিকার নষ্ট করা ভারসাম্যপূর্ণ জীবন নয়।

দয়া ও দৃঢ়তার সমন্বয়

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

তবে তাঁর কোমলতা সত্য ও ন্যায়ের সঙ্গে আপসের অর্থ ছিল না। আয়েশা (রা.) বলেন, দুটি বিষয়ের মধ্যে নির্বাচন করতে দেওয়া হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) পাপের বিষয় না হলে সহজতরটি গ্রহণ করতেন। আর কোনো বিষয় পাপের হলে তা থেকে সবার চেয়ে দূরে থাকতেন। ব্যক্তিগত বিষয়ে কষ্ট দেওয়া হলেও তিনি নিজের জন্য প্রতিশোধ নিতেন না; তবে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয় লঙ্ঘিত হলে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১২৬)

অর্থাৎ, দয়া সত্যকে দুর্বল করে না এবং দৃঢ়তা হৃদয়কে কঠোর করে না।

ভুল সংশোধনে কোমলতা

রাসুলুল্লাহ (সা.) ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রেও ধমক বা অপমানের পরিবর্তে শিক্ষা ও কোমলতার পথ অনুসরণ করতেন। একবার এক গ্রাম্য ব্যক্তি মসজিদে প্রস্রাব করে ফেললে সাহাবিরা তাকে বাধা দিতে এগিয়ে যান। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তাকে ছেড়ে দাও।’

পরে সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দিতে বলেন এবং জানান, ‘তোমাদের তো সহজকারী হিসেবে পাঠানো হয়েছে, কঠিনকারী হিসেবে পাঠানো হয়নি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২০)

এই ঘটনায় ভুলকারীকে অপমান না করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং পরে তাকে শিক্ষা দেওয়ার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

দুঃখ-আনন্দেও ভারসাম্য

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পুত্র ইবরাহিমের মৃত্যুর সময় কেঁদেছিলেন। তিনি বলেন, ‘চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, হৃদয় দুঃখিত হয়; কিন্তু আমরা এমন কোনো কথা বলি না যা আমাদের রবকে অসন্তুষ্ট করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩০৩)

ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতিকে অস্বীকার করে না; বরং তা ঈমানের সীমার মধ্যে পরিচালনার শিক্ষা দেয়। দুঃখ থাকবে, কান্না থাকবে, কিন্তু হতাশা নয়। আনন্দ থাকবে, তবে গাফিলত নয়।

পরিবারে ভালোবাসা ও দায়িত্ব

পরিবারের প্রতিও রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন অত্যন্ত কোমল ও সহযোগিতাপূর্ণ। আয়েশা (রা.)-কে তাঁর ঘরের কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘তিনি তাঁর পরিবারের কাজে ব্যস্ত থাকতেন/পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৮৯)

তিনি স্ত্রীদের অধিকার রক্ষা করতেন এবং তাঁদের প্রতি ন্যায়বিচার করতেন। এতে বোঝা যায়, পারিবারিক ভারসাম্য শুধু কথার বিষয় নয়; বরং ভালোবাসা, সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে তা প্রতিষ্ঠিত হয়।

নেতৃত্বে সাহসের সঙ্গে পরিকল্পনা

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সাহসী, তবে বেপরোয়া ছিলেন না। আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি তিনি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় উপায় অবলম্বন করতেন। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় উপযুক্ত সঙ্গী নির্বাচন, দুটি উট প্রস্তুত রাখা, প্রচলিত পথের পরিবর্তে ভিন্ন পথ বেছে নেওয়া, গুহায় অবস্থান এবং দক্ষ পথপ্রদর্শকের সহায়তা নেওয়া ছিল তাঁর পরিকল্পনার অংশ।

তবে এসব প্রস্তুতির পাশাপাশি তাঁর অন্তর ছিল আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। গুহায় আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘চিন্তা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : আত-তাওবা, আয়াত : ৪০)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন তাই শেখায়—ইবাদতে যেমন ভারসাম্য প্রয়োজন, তেমনি পরিবার, সমাজ, নেতৃত্ব, অনুভূতি ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন পরিমিতি, ন্যায় ও প্রজ্ঞা। তাঁর জীবনাচরণে এই ভারসাম্যই একজন মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ হয়ে রয়েছে।

জ/উ





Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম ও জীবন - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]