প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা ধরনের তুলনা আধুনিক মানুষের মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তির বড় কারণ হয়ে উঠছে। মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দৈনন্দিন জীবনের বাহ্যিক চাপের পাশাপাশি মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি তথ্য গ্রহণ এবং চারপাশের সবকিছু নিয়ে অতিরিক্ত সচেতন থাকার প্রবণতাও দ্রুত মানসিক অবসাদ তৈরি করছে।
বিবর্তন ও মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মন এমনভাবে বিকশিত হয়েছে, যেখানে তুলনামূলকভাবে ছোট একটি সামাজিক পরিসরের সীমিত সমস্যা মোকাবিলা করাই ছিল মূল বিষয়। কিন্তু ডিজিটাল যুগে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। এখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের সংকট, যুদ্ধ, অন্য মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সাফল্য কিংবা ভ্রমণের নানা ঝলক মুহূর্তেই মানুষের সামনে চলে আসছে। এর ফলে নিজের বাস্তব জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই-এমন অসংখ্য বিষয় নিয়েও মানুষ অবচেতনভাবে মানসিক চাপ অনুভব করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের আপাত সফলতার সঙ্গে নিজের জীবনকে নিয়মিত তুলনা করাও এই মানসিক ভারকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ এসব মাধ্যমে সাধারণত মানুষের জীবনের বাছাই করা ইতিবাচক মুহূর্তগুলোই বেশি দৃশ্যমান হয়; যা কারও পুরো জীবনের বাস্তব চিত্র নয়। তারপরও এই অসম তুলনায় জড়িয়ে পড়ে অনেকেই নিজের সক্ষমতা, জীবনযাপন ও স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে অপ্রয়োজনীয় অতৃপ্তিতে ভুগতে শুরু করেন।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের মানসিক ক্লান্তি কমাতে জীবনযাত্রায় কিছু মৌলিক শৃঙ্খলা আনা প্রয়োজন। দীর্ঘ এক মাসের দুশ্চিন্তা একসঙ্গে মাথায় না নিয়ে সময়কে ছোট পরিসরে ভাগ করে প্রতিদিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করার দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কোন বিষয় নিজের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং কোনটি কেবল তথ্য-এই পার্থক্যটিও স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে। এতে নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর মানসিক দায় নেওয়ার প্রবণতা কমবে।
এর পাশাপাশি ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমারেখা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সারাদিন বিরতিহীনভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সংবাদ অনুসরণ না করে দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় এসব থেকে পুরোপুরি দূরে থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। কর্মঘণ্টা শেষ হওয়ার পর ব্যক্তিগত সময়কে আলাদা রাখাও মনোযোগ ও মানসিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।
সব বিষয় একসঙ্গে সামাল দেওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে অপ্রয়োজনীয় তথ্য ও তুলনাকে জীবন থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখাই মানসিক অবসাদ কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
জ/উ