‘কথা বলা ছিল পাপ, সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা ছিল ঘোরতর অন্যায়’-সেই সময় পেরিয়ে এবার মুক্ত গণমাধ্যমের প্রতিশ্রুতি। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে এমনই এক বার্তা সামনে এসেছে। একদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্মরণ করলেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত থাকার সময় সাংবাদিকদের চাপ, নিগ্রহ ও জেল-জুলুমের কথা; অন্যদিকে তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ ঘোষণা দিলেন-‘ইনশাআল্লাহ, আমাদের সময়ে আপনারা ফ্রি মিডিয়া পাবেন।’
‘ঐক্য-সমৃদ্ধির’ ৩১ বছর স্লোগানে বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ডিআরইউ চত্বরে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়। সকাল ১০টায় জাতীয় পতাকা ও সংগঠনের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে শুরু হয় কর্মসূচি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বেলুন ও শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। পরে ডিআরইউ প্রাঙ্গণ থেকে বের হয় বর্ণাঢ্য র্যালি।
র্যালি শেষে রিজভী বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র অর্জনে ডিআরইউ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, এমন সময় ছিল যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবদমিত ছিল, কথা বলা ছিল পাপ এবং সরকারের বিরুদ্ধে যায়-এমন কথা বলা ছিল ঘোরতর অন্যায়। সেই পরিস্থিতিতেও যতটুকু সুযোগ পাওয়া গেছে, ডিআরইউর সাংবাদিকরা তা মানুষের সামনে তুলে ধরতে দ্বিধা করেননি।
সাংবাদিকদের ওপর নানা ধরনের চাপের কথাও তুলে ধরেন রিজভী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক সাংবাদিককে বিভিন্ন কালো আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় নিগৃহীত হতে হয়েছে; সহ্য করতে হয়েছে জেল-জুলুমও।
তবে অতীতের সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে একটি মুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। রিজভী বলেন, সরকারে থাকা, সরকারের বাইরে থাকা কিংবা বিরোধী দলে থাকা-সব পক্ষকেই মুক্ত কণ্ঠে সমালোচনা করতে হবে। সরকারের কাজের গঠনমূলক সমালোচনার মধ্য দিয়েই একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। তাঁর মতে, এই প্রত্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ গণমাধ্যম।
অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, দেশের গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে সংবাদমাধ্যমের বড় ভূমিকা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, দেশের যত অর্জন, তার বড় একটি অংশের কৃতিত্ব সংবাদমাধ্যমের। সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় সরকারের হস্তক্ষেপের কোনো ইচ্ছা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমাদের সময়ে আপনারা ফ্রি মিডিয়া পাবেন।’
সরকার ও গণমাধ্যমকর্মীদের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে পার্থ বলেন, প্রধানমন্ত্রীও সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার নীতিতে বিশ্বাস করেন। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাঁদের কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণমূলক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেন, অনেকে রাজনীতিবিদদের কাজকে সবচেয়ে কঠিন মনে করলেও তাঁর মতে সাংবাদিকদের কাজই সবচেয়ে কঠিন। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এদিকে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের বরাদ্দ ৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকা করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি তাঁদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
ডিআরইউর ক্রীড়া কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে সিড মানি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের মানসিক প্রশান্তি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধিতে খেলাধুলার গুরুত্ব রয়েছে। ডিআরইউর ক্রীড়া কার্যক্রম সম্প্রসারণে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জুলাই আন্দোলনে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। লেখালেখির পাশাপাশি তাঁরা আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই আন্দোলনে ছয় সাংবাদিক শহীদ হয়েছেন; তাঁদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল। দুপুরে কেক কাটা ও শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, পেশাজীবী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। বিকেলে দেশবরেণ্য শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
১৯৯৫ সালের ২৬ মে রাজধানীর বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত রিপোর্টারদের অধিকার আদায়, পেশাগত উন্নয়ন ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কল্যাণ, প্রশিক্ষণ এবং বস্তুনিষ্ঠ ও সুস্থ সাংবাদিকতার বিকাশে সংগঠনটি বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। এ বছর ঈদুল আজহার কারণে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান পরে আয়োজন করা হয়েছে।
জ/বা