সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। আজ রোববার সকালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রীর দপ্তরে প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকে দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে চলমান নজরুল বর্ষ উদযাপন, শিল্পী ও গবেষক বিনিময়, ধ্রুপদি সংগীত, লোকসংস্কৃতি, তরুণ প্রতিভা বিকাশ এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে যৌথ উদ্যোগের বিষয় গুরুত্ব পায়।
এ সময় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম ও সচিব মিজ ইয়াসমিন বেগম উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, ভারতীয় হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার এবং ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের পরিচালক বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আত্মার সম্পর্ক। দুই দেশের মানুষের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, লোকঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর যোগসূত্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি।
তিনি বলেন, একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় তার সংস্কৃতির মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। সংস্কৃতি মানুষকে বিভক্ত না করে ঐক্যবদ্ধ করে। মোহাম্মদ রফি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, অলকা ইয়াগনিক ও পণ্ডিত রবিশঙ্করের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের সৃষ্টিকর্ম দুই দেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে জায়গা করে নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়, শিল্প ও সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় সীমারেখা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ের ভাষায় কথা বলে।
চলমান নজরুল বর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশে আয়োজিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভারতের খ্যাতিমান নজরুল গবেষক, শিল্পী ও সংস্কৃতিবিদদের অংশগ্রহণের জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী। পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন শাহ ও বাংলা লোকসংগীতকে দুই দেশের অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে ধর্মীয় উগ্রবাদ, অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন মোকাবিলায় সাংস্কৃতিক জাগরণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও লোকসংস্কৃতির মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ ও সম্প্রীতির চর্চা বাড়াতে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
বৈঠকে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম দুই দেশের মধ্যে একটি ধ্রুপদি সংগীত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ভারত থেকে দুজন ধ্রুপদি সংগীতশিল্পীকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে কর্মশালা আয়োজনের প্রস্তাবও দেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানান।
ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও দুই দেশের সম্পর্ককে আত্মার সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গভীর অভিন্নতা রয়েছে।
বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সংগীত ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দেশ হিসেবে উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়ায় আরও বৃহৎ পরিসরে আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে ভারতের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ওই অনুষ্ঠানে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।
পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত যৌথ অনুষ্ঠান আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেন ভারতীয় হাইকমিশনার। দুই দেশের তরুণ প্রতিভাবানদের জন্য যৌথ প্রশিক্ষণ, আবাসিক কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক বিনিময় চালু করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও গভীর হবে বলেও মত দেন তিনি।
বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে সামুদ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেও বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ গবেষণা ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন দীনেশ ত্রিবেদী।
বৈঠক শেষে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারত সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও জোরদার এবং নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন উভয় পক্ষ।
জ/উ