নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দেশের স্বাস্থ্য খাতের শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের ঘোষিত ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকট দূর করতে আগামী তিন মাসের মধ্যে ৭ হাজার ৫০০ চিকিৎসক ও ৫ হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ৪৮তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ১৮৪ জন চিকিৎসক আগামী ৭ সেপ্টেম্বর কর্মস্থলে যোগ দেবেন। তাদের মধ্যে সহকারী ডেন্টাল সার্জন ১৯ জন এবং সহকারী সার্জন ১৬৫ জন।
স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ৩০ জুন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রশাসন-৩ (মনিটরিং ও সমন্বয়) শাখা থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনবল এবং শূন্য পদের হালনাগাদ তথ্য চাওয়া হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়, নির্বাচন-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন অধিদপ্তর, সংস্থা ও বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শূন্য পদের পদভিত্তিক তালিকা জরুরি ভিত্তিতে পাঠাতে হবে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ২ লাখ ৩৪ হাজার ২৪টি। এর মধ্যে ৭৩ হাজার ৪৫টি পদ শূন্য রয়েছে, যা মোট অনুমোদিত পদের ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ।
এদিকে গত ২০ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী স্বাক্ষরিত চিঠিতে দেশের সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জনবল নিয়োগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের গত ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত মাসিক সমন্বয় সভার সিদ্ধান্তের আলোকে ওই চিঠিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব প্রতিষ্ঠানের জনবলের ঘাটতি পূরণে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেসব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও আবেদন গ্রহণ করা হলেও নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়নি, সেসব প্রতিষ্ঠানে নতুন শূন্য পদের ছাড়পত্র নিয়ে পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। আগের আবেদনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। পাশাপাশি নিয়োগ-সংক্রান্ত কোনো মামলা বা প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে তা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যাপক জনবল নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হবে এবং সারা দেশে শক্তিশালী প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন পদে অন্তত ১ লাখ দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী।
ইশতেহারের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘স্বাস্থ্যসেবা’ শিরোনামে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য কোনো সুযোগ-সুবিধা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ) নিশ্চিত করাই বিএনপির লক্ষ্য।
এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ৩৪ হাজার ৭১৪টি শূন্য পদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
চিঠির তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএসের মানবসম্পদ তথ্যব্যবস্থা (এইচআরআইএস) অনুযায়ী ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডে ২০ হাজার ৮১৬টি এবং ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে ১৩ হাজার ৩৮৯টি পদ শূন্য রয়েছে। সব মিলিয়ে শূন্য পদের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৭১৪টি।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য খাতের শূন্য পদ পূরণের কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠানো হয়েছে। ধাপে ধাপে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হবে।
তিনি বলেন, জনবল নিয়োগের অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। খুব দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তারা।
অন্যদিকে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীন ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের ১ হাজার ৮৫৫টি পদে জনবল নিয়োগের জন্য আগে দেওয়া ছাড়পত্রের মেয়াদ বাড়িয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব পদে নিয়োগের ছাড়পত্র ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
এই ছাড়পত্রের আওতায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সদর দপ্তর পর্যায়ে ১৭ ক্যাটাগরির ১ হাজার ৬৬৭টি এবং জেলা পর্যায়ে চার ক্যাটাগরির ১৮৮টি পদ রয়েছে। সব মিলিয়ে নিয়োগের জন্য ছাড়পত্র পাওয়া পদের সংখ্যা ১ হাজার ৮৫৫টি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পর্যায়ক্রমে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে দেশের সব সরকারি হাসপাতালে বিদ্যমান শূন্য পদে জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জ/উ