ইসলামে গোপনে ইবাদত ও নেক আমলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গোপনে দান-সদকা করা, মানুষের মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়া, কারও মন ভালো করা, কারও অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করা কিংবা নীরবে নেক আমল করা—এসব একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে নেক আমল করার পাশাপাশি তা নষ্ট বা দুর্বল করে দিতে পারে এমন বিষয় থেকেও সতর্ক থাকা জরুরি।
বছরের পর বছর ইবাদত করার পরও অন্তর বা জিহ্বার কোনো রোগের কারণে আমলের সওয়াব কমে যেতে পারে। তাই মুসলিম মনীষীরা আমল করার পাশাপাশি তা সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। গোপন ইবাদত নষ্ট বা দুর্বল করে দিতে পারে এমন কয়েকটি বিষয় হলো—
১. গোপন রিয়া বা লোকদেখানো
রিয়া অন্তরের অন্যতম বিপজ্জনক রোগ। অনেক সময় মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না যে তার আমলের মধ্যে রিয়া প্রবেশ করেছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমল শুরু করার পর মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়া, প্রশংসা না পেলে কষ্ট পাওয়া কিংবা মানুষ না থাকলে নেক আমল ছেড়ে দেওয়া—এসব রিয়ার লক্ষণ হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাতের আশা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।’ (সুরা আল-কাহফ, আয়াত ১১০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির আশঙ্কা করি তা হলো ছোট শিরক।’ সাহাবিরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রিয়া।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ২৩৬৩০)
২. নিজের আমল নিয়ে অহংকার করা
নেক আমল করতে করতে কেউ নিজের প্রতি মুগ্ধ হয়ে যেতে পারেন এবং অন্যদের তুলনায় নিজেকে উত্তম মনে করতে পারেন। এটিও আমলের জন্য বিপজ্জনক। একজন মুমিনের আমল যত বাড়বে, তার বিনয়ও তত বৃদ্ধি পাওয়া উচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি কোরো না। কে তাকওয়াবান, তিনি তা ভালো জানেন।’ (সুরা আন-নাজম, আয়াত ৩২)
৩. উপকার করে খোঁটা দেওয়া
কেউ গোপনে দান করার পর পরে সেই দানের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন। আবার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখে সেই উপকারের কথা বলে অহংকার করাও আমলের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দান-সদকা নষ্ট কোরো না।’ (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২৬৪)
৪. ছোট নেক আমলকে তুচ্ছ মনে করা
ছোট আমলের কোনো মূল্য নেই—এমন ধারণাও শয়তানের একটি ফাঁদ হতে পারে। হাসিমুখে কথা বলা, সামান্য জিকির করা, কারও জন্য দোয়া করা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া কিংবা সামান্য সদকাকেও অবহেলা করা উচিত নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অর্ধেক খেজুর দান করে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো; যদি তা-ও না পাও, তবে একটি ভালো কথা বলো।’ (বুখারি, হাদিস ৬৫৪০)
৫. দ্রুত ফল না পেয়ে অধৈর্য হওয়া
দোয়া করার পর দ্রুত ফল না পেয়ে হতাশ হওয়া কিংবা মানুষের মধ্যে মীমাংসার চেষ্টা করে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন না দেখে নিরাশ হয়ে যাওয়া ঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারো দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে—আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।’ (বুখারি, হাদিস ৬৩৪০)
৬. গুনাহের পর ইবাদত ছেড়ে দেওয়া
গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর কেউ নিজেকে ইবাদতের অনুপযুক্ত মনে করতে পারেন। ‘আমি তো গুনাহগার, আমার আর তাহাজ্জুদ পড়ার অধিকার নেই’—এমন চিন্তা শয়তানের প্রতারণা হতে পারে। বরং গুনাহের পর তাওবা করে আরও বেশি নেক আমলের দিকে ফিরে আসা উচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩)
৭. ইবাদতের কারণে অন্যকে তুচ্ছ মনে করা
নিজের গোপন ইবাদত ঠিক রাখলেও কেউ যদি গুনাহগার মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে শুরু করেন, সেটিও ইসলামের শিক্ষা নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২১৩)
৮. অন্যের আমল নিয়ে ব্যস্ত থাকা
অন্য কে কতটুকু ইবাদত করেন, কে কত গুনাহ করেন কিংবা কে কী ভুল করছেন—এসব হিসাব করতে গিয়ে নিজের আমল ও অন্তরের সংশোধনের কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
আল্লাহ বলেন, ‘বরং মানুষ নিজেই নিজের সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত।’ (সুরা আল-কিয়ামাহ, আয়াত ১৪)
৯. আমল কবুলের জন্য দোয়া না করা
নেক আমল করার পর তা কবুল হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত। ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.) কাবা নির্মাণের মতো মহান কাজ করার সময়ও আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১২৭)
তাই নেক আমল করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই আমলকে রিয়া, অহংকার, খোঁটা, হতাশা ও অন্যকে তুচ্ছ করার মতো বিষয় থেকে হেফাজত করাও জরুরি। নিজের আমল নিয়ে গর্ব না করে তা কবুলের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং নিয়মিত আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করাই মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জ/উ