খন্দকার হানিফ রাজা

অপরাধ

2026-08-09T19:50:16+06:00
2026-08-09T19:50:16+06:00
সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
বাংলা English
সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
অপরাধ
৩৯৯ জন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে, ফিরেছেন ২৩৪ জন; এখনও বন্দি ১৬৫ জন
নাফ নদীতে জেলে ‘জিম্মি’ বাণিজ্য আরাকান আর্মির
নতুন করে ৩ জেলে আটক, মুক্তিপণের অভিযোগ ১৪ জনের
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫০ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর এখন টেকনাফের জেলেদের জন্য জীবিকার পাশাপাশি আতঙ্কেরও কারণ হয়ে উঠেছে। মাছ ধরতে গিয়ে সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে একের পর এক জেলে আটক হচ্ছেন। কেউ বিজিবির মধ্যস্থতায় ফিরছেন, আবার কারও মুক্তির ক্ষেত্রে মুক্তিপণ দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। সর্বশেষ গত শনিবারও তিন জেলেকে একটি ট্রলারসহ ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৮ আগস্ট দুপুরে শাহপরীর দ্বীপের নাইক্ষ্যংদিয়া সংলগ্ন নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর এলাকায় মাছ ধরার সময় জসিম উদ্দিন, মোহাম্মদ ইসমাইল ও হারুনকে ট্রলারসহ ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মির সদস্যরা। এ সময় আরও দুই জেলে পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরতে সক্ষম হন। ঘটনার এক দিন পরও আটক তিনজনকে ফেরত দেওয়া হয়নি।

 এ প্রসঙ্গে শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়া নৌঘাট কমিটির সভাপতি আব্দুল গণি বলেন, আরাকান আর্মির সদস্যরা স্পিডবোটে এসে অস্ত্রের মুখে জেলেদের ধরে নিয়ে যায়। নাফ নদীতে সীমানা চিহ্ন না থাকায় স্রোতের টানে জেলেরা প্রায়ই অজান্তে সীমান্ত অতিক্রম করেন। তিনি নিরাপদ মাছ ধরার জন্য জলসীমায় বয়া ও সীমানা চিহ্ন স্থাপনের দাবি জানান।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম অনীক চৌধুরী তিন জেলেকে ট্রলারসহ ধরে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

৩৯৯ জন আটক, এখনও বন্দি ১৬৫ জন: বিজিবির ১২ মে ২০২৬ পর্যন্ত সমন্বিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর এলাকায় আরাকান আর্মি ৩৯৯ জেলেকে আটক করেছে। তাদের মধ্যে ২৩৪ জন ফিরে এসেছেন, আর ১৬৫ জন এখনো আটক। বন্দিদের মধ্যে ৮১ জন বাংলাদেশি ও ৮৪ জন রোহিঙ্গা। ফেরত আসা ২৩৪ জনের মধ্যে ১৪৩ জন বাংলাদেশি এবং ৯১ জন রোহিঙ্গা।

অর্থাৎ, আটক হওয়া জেলেদের প্রায় ৫৯ শতাংশ ফিরলেও ৪১ শতাংশ এখনো বন্দি। তবে বিজিবির ওই হিসাবের পরও নতুন আটকের ঘটনাও ঘটেছে। গত ১৮ মে চার বাংলাদেশি জেলেকে দুটি নৌকাসহ ধরে নেওয়া হয়। পরে একজন সাঁতরে ফিরে আসেন। ১৫ জুন নাফ নদীর মোহনা থেকে দুটি নৌকাসহ আরও সাত জেলেকে ধরে নেওয়ার খবর পাওয়া যায়।

মুক্তিপণের অভিযোগ: জেলেদের আটকের ঘটনায় মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব নেই। ২৮ মার্চ নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকা থেকে ১৪ জেলেকে ধরে নেওয়ার চার দিন পর তারা দেশে ফেরেন। স্থানীয় পরিবারগুলোর দাবি, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে বিজিবি ও প্রশাসন অর্থ লেনদেনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

গত ২০২৫ সালের কয়েকটি প্রতিবেদনে ফিরে আসা জেলেরা অভিযোগ করেন, আরাকান আর্মি বাংলাদেশি সিম ব্যবহার করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ দাবি করত। তবে ২৩৪ জনের সবাই মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছেন—এমন কোনো তথ্য নেই। বিজিবির মধ্যস্থতায় আলোচনার মাধ্যমে বহু জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে।

বন্দিদের নিয়ে উদ্বেগ: বিজিবির হিসাবে ১৬৫ জন এখনো আরাকান আর্মির হেফাজতে। কয়েকজনকে এক বছরের বেশি সময় ধরে আটকে রাখার তথ্যও এসেছে। ফিরে আসা কয়েকজন জেলে বন্দিদশায় নির্যাতন ও অমানবিক পরিবেশের অভিযোগ করেছেন।
জেলেরা বলছেন, নাফ নদীর নাব্যতা, জোয়ার-ভাটা ও সীমানা চিহ্নের অভাবে মাছ ধরার নৌকা অনেক সময় অনিচ্ছায় মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে পড়ে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে মংডু ও আশপাশের এলাকায় আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান মনে করেন, মিয়ানমারের সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। আরাকান আর্মির মতো অ-রাষ্ট্রীয় শক্তি সীমান্তকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করলে তা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। প্রয়োজনে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়াই তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পথ বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি এম হুমায়ুন কবির রাখাইনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন নাফ নদী ও সেন্টমার্টিনের ভৌগোলিক নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা তুলে ধরে সতর্ক করেছেন।

সমাধান কোথায়?: ৩৯৯ জন আটক, ২৩৪ জন ফেরত এবং ১৬৫ জন এখনো বন্দি,এর সঙ্গে নতুন করে আটকের ঘটনা যোগ হওয়ায় সীমান্তের ঝুঁকি স্পষ্ট হচ্ছে। জেলেদের নিরাপত্তায় দ্রুত জলসীমা চিহ্নিতকরণ, নিরাপদ মাছ ধরার করিডর, নৌ-টহল বাড়ানো এবং বন্দি জেলেদের ফেরাতে কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ জরুরি হয়ে উঠেছে।

নোট: ৩৯৯, ২৩৪ ও ১৬৫-এর হিসাব ১২ মে ২০২৬ পর্যন্ত বিজিবির সমন্বিত তথ্য। এরপর মে ও জুনে নতুন আটকের ঘটনা ঘটেছে; ৯ আগস্ট পর্যন্ত নতুন সমন্বিত সরকারি সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি।

জ/বা






Loading...
Loading...
অপরাধ - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]