প্লাস্টিক পন্যের দাপটে বাঁশ শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি

দেশজুড়ে

2026-07-19T13:54:22+06:00
2026-07-19T13:54:22+06:00
বুধবার ● ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
Advertisement
দেশজুড়ে
প্লাস্টিক পন্যের দাপটে বাঁশ শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
⏲ ১:৫৪ পিএম | ১৯ জুলাই, ২০২৬ | রোববার
প্লাস্টিক পন্যের দাপটে বাঁশ শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
বাঁশ শিল্প এক সময়ে বাঙালির প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখেছিলো। কালের বিবর্তনে এ শিল্প আজ বিলুপ্তের পথে। পর্যাপ্ত পুঁজি সংকট, শ্রমিকের মুজুরী বৃদ্ধি, নির্বিচারে বাঁশ ধংসের কারণে বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়া, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া। প্লাস্টিক পণ্যের দাপট  ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে খাগড়াছড়িতে ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে।

ঐতিহ্যবাহী বাপ -দাদার এ পেশাকে ধরে রাখতে বাঁশ শিল্পকে কোনোরকম টিকিয়ে রেখেছেন কিছু কারিগর। যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে বাঁশ দিয়ে  তৈরি করে চলেছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। খাগড়াছড়িতে একসময় বাঁশ শিল্পের রমরমা অবস্থা ছিল। বাঁশ দিয়ে তৈরি হতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এসবের মধ্যে ছিল বাঁশের চাটায়, কুলা, ডালা, চালুন, ঝুড়ি, মোড়া, খলই, ডালি, মুরগীর খাঁচা, মই, ধানের গোলা, ওড়া, মাছ ধরার ডার্কি, খেলনা, বিভিন্ন সজ্জার সামগ্রী। 

এসব পণ্যের চাহিদাও ছিল ব্যাপক, বিশেষ করে জেলা সদর, দীঘিনালা, পানছড়ি, মহালছড়ি, মাটিরাঙা, গুইমারা, রামগড়, মানিকছড়ি, লক্ষীছড়ির গ্রামীণ জনপদের হাট-বাজারগুলোতে ব্যাপকভাবে এর বিক্রি লক্ষ্য করা যেত। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় ও সহজলভ্য প্লাস্টিক পণ্যের আগমনে বাঁশের তৈরি পণ্যের বাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে। প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসপত্র দামে সস্তা ও টেকসই হওয়ায় ক্রেতারা সেদিকেই বেশি ঝুঁকছেন।

বিগত কয়েক বছর ধরে বাঁশের তৈরি পণ্যের চাহিদা হ্রাস, কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা ও প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক আধিপত্যের কারণে বাঁশ শিল্পের এই নাজুক পরিস্থিতি। যার ফলে খাগড়াছড়ির স্হানীয় কারিগরদের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিসহ। এতে গ্রামীণ এই শিল্পটি তার জৌলুস হারাচ্ছে। তেমনই এ শিল্পের উপর নির্ভরশীল লোকজন বেকার হয়ে মানবেতন জীবন যাপন করছে। অনেকেই আবার এ পেশা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে অন্য পেশায়। যা এই শিল্পের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

মাটিরাঙ্গা উপজেলার আর্দশ গ্রামের বাঁশ শিল্প কারিগর মো: রহমত আলী বলেন, এমন একটা সময় ছিলো যখন বাঁশ শিল্পের প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাহাড়ের মানুষের আয়ের উৎস ছিলো। বাঁশের তৈরী সেই হস্তশিল্প বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করা অর্থ দিয়ে তাদের ছেলে-মেয়ের পড়াশুনাসহ সংসারের কাজে ব্যয় করা হতো। বর্তমানে প্লাস্টিক সামগ্রির কারনে এর চাহিদা না থাকায় ও ক্রেতার অভাবে এ পেশা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। 

বাঁশের তৈরি একটি পণ্য তৈরি করতে যে সময় ও শ্রম লাগে, তার তুলনায় তারা ন্যায্য মূল্য পান না। উপরন্তু কাঁচামাল হিসেবে বাঁশের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাহাড়ের সবজি হিসেবে ব্যবহারিত "বাঁশ কোড়ল" কচি বাঁশ গুলো ক্রমাগত ধংসের কারণে বাঁশ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় দূরদূরান্ত থেকে চড়া দামে বাঁশ কিনতে হয়, যা উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে দেয়।

বাঁশের আসবাব পত্র বিক্রেতা শাহআলম (৬৫) নিজেই কারিগর ৪০ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আগে বাঁশের হস্তশিল্প বিক্রি করে সংসার ভালোই চলতো। এখন আর চলে না। ছেলেমেয়েরা এই কাজ শিখতে চায় না, কারণ এতে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বাধ্য হয়ে অন্য কাজ খুঁজতে হচ্ছে। তার মতো আরও অনেক কারিগর এ পেশা ছেড়ে দিয়ে এখন দিনমজুরের কাজ করছেন। 

এ শিল্পের সাথে জড়িত নারী কারিগর আশা আক্তার, রহিমা বেগম, নার্গিস আক্তার, ছালেহা বেগমসহ অন্যরা বলেন, আমরা এখন অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছি। বাঁশের তৈরি আসবাব পত্রের স্বল্প সংখ্যক  চাহিদা থাকলেও অর্থ সংকটের কারনে তা পূরন করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা আরোও বলেন, বাঁশ চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সরকারি কোন পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্হা গ্রহন করা হলে নতুন নতুন ডিজাইন ও পণ্যের বৈচিত্র্য এনে শহুরে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা যেত।

এক সময় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই বাঁশের তৈরি এসব জিনিসপত্রের ব্যবহার ছিল। ৬/৭ বছর আগেও মাঝারী ধরনের একটি বাঁশের মুল্য ছিল ৩০ থেকে ৫০ টাকা। বর্তমানে সে ধরনের একটি বাঁশ বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। কিন্তু সে অনুপাতে বাঁশের তৈরী এসব পন্যের মূল্য বাড়েনি। তাছাড়া বর্তমান প্লাষ্টিকের তৈরি জিনিসপত্র এসব পণ্যের স্থান দখল করে নিয়েছে। দামও কম। ফলে প্লাষ্টিকের তৈরি এসব জিনিসপত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ কুটির শিল্পটি। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাঁশ শিল্প শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতিরও অংশ। এই শিল্প বিলুপ্ত হলে আমরা একটি ঐতিহ্য হারাবো। তাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কারিগরদের জীবনমান উন্নয়ন ও তাদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা জরুরি। যাতে এ শিল্পের কারিগরদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। তাহলে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে। 



Advertisement
সর্বশেষ
‹ ›
সর্বাধিক পঠিত
‹ ›
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত