যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের পেছনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করা অনেক ভোটার এবার ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। এসব ভোটারের সমর্থন ফিরে পেতে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ধরন পরিবর্তনসহ কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
গত ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ৪ নভেম্বর প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থীরা বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে, বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা রেকর্ড সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ও উচ্চকক্ষ সিনেট—উভয়টির নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছেন।
এ ফলাফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতদিন কংগ্রেসে ট্রাম্প প্রশাসনের যে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব ছিল, নির্বাচনের পর তা অনেকটাই কমে গেছে। মার্কিন রাজনীতি বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের নীতিমালার প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের প্রতিফলন।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ভ্যান্স বলেন, ট্রাম্পের অনেক সমর্থক ডেমোক্রেটিক পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়ায় দলটি ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট লেখেন, ‘মূল সমস্যা হলো, ২০২৪ সালে যারা ট্রাম্প-ভ্যান্সকে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই ২০২৬ সালে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন।’
নিজের বক্তব্যের পক্ষে কয়েকজন নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপকারীর কথা উল্লেখ করেন ভ্যান্স। তাঁদের একজন আগেই ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
ভ্যান্স জানান, দল ছেড়ে যাওয়া ভোটার ও সমর্থকদের কাছে ওই জরিপকারী জানতে চেয়েছিলেন, কী পদক্ষেপ নিলে তাঁরা আবার রিপাবলিকানদের সমর্থনে ফিরে আসবেন। তাঁদের উত্তরগুলো বিশ্লেষণ করে চারটি প্রধান বিষয় উঠে এসেছে।
বিষয়গুলো হলো—ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়া, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা আমেরিকার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি অনুসরণ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ধরন পরিবর্তন করা।
নিজের পোস্টে একজন রক্ষণশীল মার্কিন টেলিভিশন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক পরামর্শের কথাও তুলে ধরেন ভ্যান্স। ওই ব্যক্তি ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরান সংঘাত কূটনৈতিকভাবে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ভ্যান্স লেখেন, ‘এখন দেখা যাচ্ছে, তাঁর রাজনৈতিক পরামর্শটি সঠিক ছিল। আমরা যে হেরেছি, তার কারণ হলো এই যুদ্ধ। গত রাতে প্রেসিডেন্ট নিজেও এমনটাই বলেছেন।’
মঙ্গলবার গভীর রাতে ট্রাম্পও স্বীকার করেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় রিপাবলিকানদের পরাজয়ে প্রভাব পড়েছে। তবে তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের পক্ষে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন। ভ্যান্সের দীর্ঘ পোস্টে অবশ্য যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের পক্ষে এমন সমর্থন দেখা যায়নি।
বুধবার ভ্যান্সের মন্তব্য নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে পরবর্তী মূল্যায়নে তাঁর কোনো আপত্তি নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগে ভ্যান্স এর বিরোধিতা করেছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর আপত্তির কারণেই এপ্রিলের পর থেকে ইরানের বিরুদ্ধে আর কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেয়নি ইসরায়েল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েল ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্প বরাবরই জোরালো সমর্থন জানিয়ে আসছেন। তবে এ বিষয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সংযত। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেও তাঁর নাম আলোচনায় রয়েছে। গত মাসে ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানালেও ভ্যান্স সে পথে হাঁটেননি।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করায় গত জুনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন ভ্যান্স। পরবর্তী সময়ে জুলাই মাসে তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল সরকারের কিছু অংশ আলোচনার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে মার্কিন জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে।
এ ছাড়া গত মাসে ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ইসরায়েলের অবস্থানকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত নয়। বরং ওয়াশিংটনকে নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল
জ/শা