বরগুনার উপকূলীয় উপজেলা পাথরঘাটায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। আক্রান্তের চাপ বাড়ায় ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখা দিয়েছে শয্যাসংকট। অনেক রোগীকে হাসপাতালের মেঝেতে থেকেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসকসংকট ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভিযোগ। অন্যদিকে, প্রথম শ্রেণির পাথরঘাটা পৌরসভায় মশা নিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটানো হলেও মশার উপদ্রব কমছে না। তবে পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, সীমিত বাজেটের মধ্যেও নিয়মিত মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৭০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। বিশেষ করে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর থেকে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। গত শনিবার (১০ অক্টোবর) হাসপাতালটিতে ১৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।
ডেঙ্গুর পাশাপাশি নিউমোনিয়া, কাশি, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণসহ ঋতু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর চাপও রয়েছে। ফলে সীমিত শয্যা ও জনবল নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এর আগে ২০২৫ সালে ডেঙ্গুর অন্যতম হটস্পট হিসেবে আলোচনায় আসে বরগুনা জেলা। ওই বছর জেলাটিতে ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তার ঘটে। বিভিন্ন সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। পাথরঘাটা উপজেলাতেও ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল উদ্বেগজনক। গত বছরের সেই পরিস্থিতির পর চলতি বছর আবারও রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
ডেঙ্গু রোগীর চাপের মধ্যেই পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকসংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের ২৯টি পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। ফলে বহির্বিভাগ ও আন্তর্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনেও চিকিৎসক পেতে দুর্ভোগের অভিযোগ করেছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। পাশাপাশি হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগী কবির জানান, গত বুধবার (৭ অক্টোবর) তাঁর রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা ৫০ হাজার থাকায় হাসপাতালে ভর্তি হন। তিন দিন চিকিৎসার পর প্লাটিলেটের সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ৫ হাজার হয়েছে। তবে চিকিৎসকসংকটের কারণে জরুরি প্রয়োজনে চিকিৎসাসেবা পেতে বেগ পেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন লিমন বলেন, দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। অসুস্থ রোগীদের জন্য এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা অত্যন্ত কষ্টকর। এর পাশাপাশি হাসপাতালের মেঝেতে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় রোগীদের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে অবস্থান করতে হচ্ছে।
পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেহেদী জানান, হাসপাতালে চিকিৎসকের ২৯টি পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। চিকিৎসকের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী, টেকনোলজিস্ট ও টেকনিশিয়ানের পদেও তীব্র জনবলসংকট রয়েছে। সীমিত জনবল নিয়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, চিকিৎসকসংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পৌর এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় মশা নিধন কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, পৌরসভা থেকে মাঝেমধ্যে ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছিটানো হলেও মশার উপদ্রব কমছে না। মশা নিধনে ব্যবহৃত ওষুধের মান ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
বাসিন্দাদের দাবি, প্রথম শ্রেণির একটি পৌরসভায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিকল্পিত ও নিয়মিত কার্যক্রম থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে এর যথাযথ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
তাঁদের অভিযোগ, প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত মশা নিধনের ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও অনেক এলাকায় সপ্তাহে একবার কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। আবার কোথাও দীর্ঘ সময় মশা নিধনের কার্যক্রম চোখে পড়ছে না।
শুধু ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছিটানোর পরিবর্তে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নালা-নর্দমা পরিষ্কার, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং কার্যকর ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
দুই মাসের ছুটিতে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন প্রবাসী নাঈম হাসান। তিনি জানান, দেশে ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, পৌরসভা থেকে মশা নিধনে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। মাঝেমধ্যে ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছিটানো হলেও মশা কমছে না।
নাঈম হাসান আরও বলেন, প্রথম শ্রেণির একটি পৌরসভায় নাগরিকদের জন্য মশা নিধনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অথচ ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও মশা নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এ ধরনের নাগরিক সেবা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।
বিএনপি নেতা ও সমাজসেবী এরফান আহমেদ সোয়েন বলেন, পাথরঘাটায় উদ্বেগজনক হারে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পৌর কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাও সাধ্যমতো মশা নিধনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে শুধু পৌরসভার উদ্যোগে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এ জন্য সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।
তিনি বলেন, প্রত্যেককে নিজ নিজ বাড়ির আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না। সম্মিলিত উদ্যোগ ও জনসচেতনতার মাধ্যমেই ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করা সম্ভব।
এ বিষয়ে পাথরঘাটা পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সীমিত বাজেট ও জনবল নিয়েও ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিদিন পর্যায়ক্রমে পৌরসভার একটি করে ওয়ার্ডে ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশা নিধনের ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।
পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে বিভিন্ন এলাকার ঝোপঝাড় পরিষ্কার, ড্রেন ও নালা-নর্দমা পরিচ্ছন্ন রাখাসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, শুধু পৌরসভার উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নাগরিকদেরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। নিজ নিজ বাড়ির আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া এবং মশার বংশবিস্তার রোধে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
গত বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার পরও চলতি বছর পাথরঘাটায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পৌরসভা ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করার পাশাপাশি হাসপাতালের চিকিৎসক ও শয্যাসংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়লে সীমিত সক্ষমতার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
জ/উ