মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তবে সম্প্রচার করা হলে তিনি তা দেখবেন না বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ বিষয়ে কথা বলেন ভ্যান্স। খবর বিবিসির।
ভ্যান্স বলেন, ‘আদৌ এমনটা (মৃত্যুদণ্ডের সরাসরি সম্প্রচার) ঘটবে কি না, আমি জানি না। যদি এটি সরাসরি সম্প্রচারিত হয়, তাহলে আমি তা দেখব না।’
এর কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনাটি তিনি ‘পুরোপুরি’ সমর্থন করেন।
২০০৯ সালে টেক্সাসের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ১৩ জন নিরস্ত্র সেনাকে হত্যা এবং আরও ৩২ জনকে আহত করার দায়ে অভিযুক্ত হন নিদাল হাসান। ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে তা হবে ৬০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে পেন্টাগন ঘোষণা করে, ফোর্ট হুড ঘাঁটিতে হামলার দায়ে অভিযুক্ত সাবেক এই মার্কিন সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড আগামী ৩ ডিসেম্বর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে।
এরপর বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য জনসাধারণের জন্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। তাঁর ভাষ্য, ‘মানুষের বোঝা উচিত যে এ ধরনের কাজের জন্য গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হয়।’
শুক্রবার হোয়াইট হাউস থেকে বের হওয়ার সময় ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সন্ত্রাসীরা অপপ্রচারের কাজে ব্যবহার করতে পারে কি না।
জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘সে ১৩-১৪ জনকে হত্যা করেছে, ২০ জনেরও বেশি মানুষকে গুরুতরভাবে আহত করেছে এবং সে পুরোপুরি উন্মাদ। তাই সে কীভাবে মারা যাচ্ছে, তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। শুধু তার মৃত্যুটা নিশ্চিত হওয়া চাই। আর আমার মতে, মৃত্যুদণ্ডই তার জন্য উপযুক্ত শাস্তি।’
সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আরও তথ্য জানতে চাওয়া হলে পেন্টাগন এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।
জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য প্রচারের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নিজের ক্যাথলিক বিশ্বাসের কোনো প্রভাব রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স পাল্টা প্রশ্ন করেন, আদৌ এমন কিছু ঘটবে কি না।
তবে তিনি নিদাল হাসানের সামরিক দায়িত্বের বিষয়টি তুলে ধরেন। মার্কিন সেনাবাহিনীর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে হাসানের দায়িত্ব ছিল সেনাদের মানসিক অসুস্থতা ও অন্যান্য সমস্যার চিকিৎসা করা। অথচ তিনি সেই সেনাদেরই অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় গুলি করে হত্যা করেছিলেন।
সম্ভাব্য সরাসরি সম্প্রচারের ঘোষণা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যেই সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
রিপাবলিকান সিনেটর জন কার্টিস প্রাচীন রোমের ‘রক্তাক্ত দৃশ্যের’ ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সতর্ক করেন, জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সভ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাঁর মতে, এ ধরনের আয়োজন মৃত্যুদণ্ডকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে পারে।
কার্টিস বলেন, হেগসেথের পরিকল্পনা সেই আকাঙ্ক্ষাকে ‘উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে’। এ কারণে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, ‘ভুক্তভোগীরা গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে ন্যায়বিচার পাওয়ার যোগ্য। মৃত্যু সরাসরি সম্প্রচার করা আমাদের মর্যাদাহানি ঘটায় এবং এটি অপরাধ দমনে কার্যকর কোনো প্রতিরোধকও নয়।’
ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মারফি সিএনএনকে বলেন, মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের ধারণাটি ঘৃণ্য। এটি ইসলামিক স্টেট (আইএস) গোষ্ঠীর চালানো মৃত্যুদণ্ডের কথা মনে করিয়ে দেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জর্জিয়ার আইনপ্রণেতা ও রিপাবলিকান নেতা অস্টিন স্কট জানান, তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি পুরোপুরি সমর্থন করেন। তবে মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ‘জিহাদিরা এ কাজ করে; আমেরিকা এর চেয়ে উন্নতমানের।’
এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয় এএফপিকে জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হলে তা ‘জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের শামিল হবে এবং নির্যাতন নিষিদ্ধ করার যে কঠোর নিয়ম রয়েছে, তার লঙ্ঘন হবে।’
জ/উ