তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তাইওয়ানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া উ এ। তাঁর মতে, তাইওয়ানের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থের অংশ।
গতকাল শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) তাইপেতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এর আগে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে তিন দিনের বৈঠক শুক্রবার শেষ হয়। বৈঠকে তাইওয়ানসহ দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও এসব বিষয়ে বড় কোনো অগ্রগতির কথা প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। তবে তাইওয়ান সরকার বেইজিংয়ের এই সার্বভৌমত্বের দাবি মেনে নেয় না। দ্বীপটির নিজস্ব সরকার, সামরিক বাহিনী ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সময় শি চিনপিং তাইওয়ান প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ‘সঠিক অবস্থান’ অনুসরণ করবে।
এর পরদিন তাইওয়ানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী উকে প্রশ্ন করা হয়, তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ছাড় দিলে সেটি দেশটির স্বার্থ রক্ষা করবে কি না। জবাবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাইওয়ানকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে তাইওয়ান নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারবে। পাশাপাশি তাইওয়ানের উন্নত সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
উ বলেন, তাইওয়ানকে নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষার মতো পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা দেওয়া এবং দেশটির সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে বিশ্বের জন্য অবদান রাখার সুযোগ দেওয়া-দুটিই যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাইওয়ান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত উন্নত চিপের বড় একটি অংশ তাইওয়ানে তৈরি হয়। ফলে দ্বীপটির চিপ উৎপাদন অব্যাহত থাকা বিশ্ব প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি বর্তমানে বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে। মে মাসে বেইজিংয়ে শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির একটি প্যাকেজ তিনি সাময়িকভাবে আটকে রেখেছেন। তবে এবার ওয়াশিংটনে শির সঙ্গে বৈঠকের পর তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্প নতুন করে কোনো মন্তব্য করেননি। আটকে থাকা অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজের ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানাননি।
উ বলেন, শি ও ট্রাম্পের বৈঠক নিয়ে তাইওয়ান সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করেছে। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের কাছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়। এটি ছিল তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিক্রির চুক্তিগুলোর একটি। এ ছাড়া আরও একটি প্রস্তাবিত অস্ত্র চুক্তির মূল্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার।
শি ও ট্রাম্পের মধ্যে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোট (এপেক) এবং জি-২০ সম্মেলনের সময় আরও দুই দফা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এসব বৈঠকের আগে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত আরও পিছিয়ে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে উ বলেন, তাইওয়ান সরকার পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে সেটি তাইওয়ানের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে একই সঙ্গে নিজেদের প্রস্তুতি নেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার ওপরও জোর দেন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিকে চীনে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ১৯৭৯ সালের তাইওয়ান সম্পর্ক আইন নিয়েও কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখতে দেশটির কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিও এই আইনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
পারডিউ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তি বজায় রাখতে চায়। একই সঙ্গে কোনো পক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগও করতে চায় না। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট শি এই অবস্থানের বার্তা পেয়েছেন এবং ট্রাম্প চীনের বক্তব্য ও যুক্তি শুনেছেন। বৈঠকের পর তাইওয়ান নিয়ে চীনের অবস্থানেও কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে জানান তিনি।
শনিবার চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র পিপলস ডেইলি এক মন্তব্য প্রতিবেদনে তাইওয়ানকে চীনের ‘মূল স্বার্থগুলোর কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তাইওয়ান চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘অটুট লাল রেখা’।
চীন দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাইওয়ান চীনের অংশ এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেও দ্বীপটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার তারা রাখে। অন্যদিকে তাইওয়ান নিজেদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও স্বশাসন বজায় রেখে আসছে এবং বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করছে।
ফলে তাইওয়ান ইস্যুটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় হয়ে আছে। শি চিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বৈঠকের পরও এ বিষয়ে বড় কোনো সমঝোতার ঘোষণা আসেনি। সূত্র: রয়টার্স
জ/উ