বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধের কলমযোদ্ধা আখতার হুসেন আর নেই। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে পান্থ হুসেন ও প্রমিত হুসেনকে রেখে গেছেন।
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় প্রায় এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন আখতার হুসেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারেও ভুগছিলেন তিনি। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চার দিন আগে তাঁকে হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সেখানেই বৃহস্পতিবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার তেজকুনীপাড়ায় তাঁদের বাসার কাছে রেলওয়ে কলোনি জামে মসজিদে আখতার হুসেনের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাঁর মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে।
সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে তাঁর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। সেখানে স্ত্রী মল্লিকা হুসেনের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হবে।
১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আখতার হুসেন। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য সাহিত্যচর্চা করেছেন। ছড়া, শিশুসাহিত্য, জীবনী, অনুবাদ ও সম্পাদনাসহ বিভিন্ন ধরনের তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিকসংখ্যক ভুক্তি লেখার কৃতিত্বও রয়েছে তাঁর।
আখতার হুসেনের উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ এবং ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আখতার হুসেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/আজ রুখবে তাদের কারা’ গানটি সে সময় ব্যাপকভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। সুরকার অজিত রায়ের সুরে গানটি গেয়েছিলেন শিল্পী তিমির নন্দী।
পেশাগত জীবনে সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন আখতার হুসেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও ছিলেন তিনি।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। বাংলা একাডেমির ফেলোও ছিলেন আখতার হুসেন।
শিশু-কিশোরদের কল্পনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধকে তাঁর সাহিত্যকর্মে তুলে ধরেছেন এই লেখক। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে শোকের আবহ নেমে এসেছে। দীর্ঘ সাহিত্যকর্ম এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আখতার হুসেন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
জ/উ