আট দফা দাবিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের রংপুর অভিমুখী লংমার্চ কর্মসূচি গতকাল শনিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মসূচির বিভিন্ন পথসভায় বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন সংসদ সদস্য (এমপি) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে সফরে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে জামায়াতের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ও এমপিদের পরিবারের সদস্যসহ সফরসঙ্গীর সংখ্যা মোট ৭১ জন।
দলীয় সূত্র এ সফরকে ‘শিক্ষামূলক সফর’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের এতসংখ্যক এমপির একসঙ্গে বিদেশ সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে এবং নানা আলোচনা চলছে।
জামায়াতে ইসলামী সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর সফরকারী দলের একাংশ এয়ার এশিয়ার ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটের একে-৭০ ফ্লাইটে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। বাকি সদস্যরা পরদিন ১৪ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ায় পৌঁছান। সফরকারী দলে জামায়াতের ৩৪ এমপি, দুই কেন্দ্রীয় নেতা ও একজন লেখকসহ মোট ৭১ জন রয়েছেন। জামায়াতের নেতারা সফরটিকে শিক্ষামূলক ও ওমরা পালনের সফর হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সফরে থাকা জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশ-ই-শূরা সদস্য ও শেরপুর-১ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বলেন, ‘এটা কোনো ফরমাল (আনুষ্ঠানিক) ট্যুর না। এটা ফ্যামিলি ট্যুর, গ্রুপ ট্যুর।’
সংসদ সদস্যদের বিদেশ সফরের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ মোহাম্মদ শাহান।
তিনি বলেন, ‘এমপিদের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে দেখতে হবে তারা কোন উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। তারা যদি শিক্ষামূলক বা বিশেষ কোনো কারণে গিয়ে থাকেন তাহলে সেটা পরিষ্কার করতে সমস্যা থাকার কথা নয়। যদি সেটা স্পষ্ট না করা বা লুকানো হয় তাহলে সেখানে একটা প্রশ্ন উঠবে।’
সফররত জামায়াতের এমপিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, এ সফর রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি নয়; বরং এটি পারিবারিক প্রোগ্রাম। তাদের ভাষ্য, মালয়েশিয়ায় পৌঁছে তারা দেশটির সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তবে ওই সাক্ষাৎ কোনো প্রফেশনাল বা ফরমাল বিষয় ছিল না।
সফরে থাকা ৩৪ এমপি
জামায়াতে ইসলামীর এই সফরকারী দলে রয়েছেন ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, ঢাকা-৫ আসনের মোহাম্মদ কামাল হোসাইন, ঢাকা-১৪-এর মীর আহমাদ বিন কাসেম, চট্টগ্রাম-১৬-এর মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, পিরোজপুর-১-এর মাসুদ সাঈদী, শেরপুর-১-এর মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, গাইবান্ধা-১-এর মো. মাজেদুর রহমান, গাইবান্ধা-৫-এর মো. আবদুল ওয়ারেস, রংপুর-৬-এর মো. নুরুল আমিন, খুলনা-২-এর এস কে জাহাঙ্গীর হোসাইন হেলাল, খুলনা-৬-এর মো. আবুল কালাম আজাদ, বাগেরহাট-২-এর শেখ মঞ্জুরুল হক রাশেদ, চুয়াডাঙ্গা-১-এর মো. মাসুদ পারভেজ, নওগাঁ-২-এর মো. এনামুল হক, চুয়াডাঙ্গা-২-এর মো. রুহুল আমিন, গাজীপুর-৪-এর সালাহ উদ্দিন, কুড়িগ্রাম-৪-এর মো. মোস্তাফিজুর রহমান, যশোর-৫-এর গাজী এনামুল হক, নড়াইল-২-এর মো. আতাউর রহমান, নেত্রকোনা-৫-এর মাসুম মোস্তফা, মেহেরপুর-১-এর মো. তাজউদ্দিন খান, কুষ্টিয়া-৪-এর মো. আফজাল হোসাইন, গাইবান্ধা-২-এর মো. আবদুল করিম, ময়মনসিংহ-৬-এর মো. কামরুল হাসান, নীলফামারী-৪-এর আবদুল মুনতাকিম, নীলফামারী-২-এর আল ফারুক আবদুল লতিফ, নীলফামারী-৩-এর ওবায়দুল্লাহ সালাফি, জয়পুরহাট-১-এর মো. ফজলুর রহমান, নীলফামারী-১-এর মো. আবদুল সাত্তার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২-এর মো. মিজানুর রহমান, পাবনা-৩-এর মোহাম্মদ আলী আসগর, পাবনা-৪-এর মো. আবু তালেব মণ্ডল, রংপুর-১-এর মো. রায়হান শিরাজী এবং কুড়িগ্রাম-১-এর মো. আনোয়ারুল ইসলাম।
এ ছাড়া সংসদ সদস্য না হলেও সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন এবং জিয়াউল হক নামের একজন লেখকও সফর দলে রয়েছেন।
সফর নিয়ে যা বলছেন বিশ্লেষকেরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান মনে করেন, কোনো বড় রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা বিদেশ সফরে গেলে সেই সফর সম্পর্কে জনগণের জানার আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। তাই কোন ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে এমপিরা সফর করছেন, সেটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, ‘জামায়াত এমপিদের এ সফরের বিষয়ে আমার জানা নেই। বিষয়টা সম্পর্কে মানুষকে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। যাতে কোনো গোপনীয়তা না থাকে। যেকোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে যারা জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন, তাদের যেকোনো গতিবিধি, যেকোনো আচরণের পাবলিকলি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জনপরিসরে দেয়ার প্রয়োজন আছে। কারণ তিনি যা করছেন সেটা ব্যক্তি হিসেবে না, দল হিসেবে করছেন।’
অন্যদিকে দলের ৩৪ এমপির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য সফরের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সফরে প্রায় ৩৪ জন এমপি গেছেন। তাদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। সফরের উদ্দেশ্য হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পার্লামেন্ট ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করা এবং বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন। তারা কয়েকটি দেশে সফর করবেন।’ সূত্র: বণিক বার্তা