সুটকেসে নারীর লাশ : পরিচয় মুছে হত্যার ভয়ংকর কৌশল

খন্দকার হানিফ রাজা

অপরাধ

একটি সুটকেস। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ লাগেজ। অথচ ভেতরে নারীর খণ্ডিত মরদেহ। কখনো ট্রাঙ্কে হাত-পা বাঁধা লাশ, কখনো প্লাস্টিকের বস্তায় শরীরের অংশ। গত এক দশকে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় নারীর মরদেহ গোপন করতে এমন ভয়ংকর কৌশলের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। কোথাও নিহতের পরিচয়ই মেলেনি, কোথাও বছরের পর বছর ঝুলে আছে মামলার অগ্রগতি। আবার প্রযুক্তির সহায়তায় সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় দ্রুত শনাক্ত হয়েছে মরদেহ, ধরা পড়েছে হত্যার সঙ্গে জড়িতরা।

2026-09-19T18:35:54+06:00
2026-09-19T18:35:54+06:00
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইপেপার  বাংলা English
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
অপরাধ
সুটকেসে নারীর লাশ : পরিচয় মুছে হত্যার ভয়ংকর কৌশল
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৩৫ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
একটি সুটকেস। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ লাগেজ। অথচ ভেতরে নারীর খণ্ডিত মরদেহ। কখনো ট্রাঙ্কে হাত-পা বাঁধা লাশ, কখনো প্লাস্টিকের বস্তায় শরীরের অংশ। গত এক দশকে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় নারীর মরদেহ গোপন করতে এমন ভয়ংকর কৌশলের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। কোথাও নিহতের পরিচয়ই মেলেনি, কোথাও বছরের পর বছর ঝুলে আছে মামলার অগ্রগতি। আবার প্রযুক্তির সহায়তায় সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় দ্রুত শনাক্ত হয়েছে মরদেহ, ধরা পড়েছে হত্যার সঙ্গে জড়িতরা।

প্রকাশ্য সংবাদপত্র ও পুলিশি সূত্রে যাচাই করা ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজার কাছে একটি ট্রলি ব্যাগ থেকে নারীর কাটা দুই পা উদ্ধার করা হয়। মরদেহের বাকি অংশ পাওয়া যায়নি। মামলা হলেও নিহতের পরিচয়, গ্রেপ্তার ও চার্জশিটের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ্য অনলাইন সূত্রে পাওয়া যায়নি।

২০২১ সালে সাভারের বড়াইপাড়ায় একটি পুকুরে ভাসতে থাকা লাল সুটকেস থেকে উদ্ধার করা হয় নারীর মরদেহ। পুলিশের ধারণা ছিল, অন্য কোথাও হত্যার পর পরিচয় গোপনের উদ্দেশ্যে মরদেহটি সুটকেসে ভরে সেখানে ফেলা হয়। নিহতের পরিচয়ও তখন নিশ্চিত করা যায়নি। মামলার পরবর্তী অগ্রগতির নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

২০২৩ সালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ভাওয়ার ভিটি এলাকায় রাস্তার পাশে পড়ে থাকা নীল সুটকেস থেকে উদ্ধার হয় প্রায় ২৫ বছর বয়সী এক নারীর মরদেহ। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠায় এবং মামলা করে। কিন্তু পরিচয়, গ্রেপ্তার বা চার্জশিটের বিষয়ে পরবর্তী নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

তবে ২০২৬ সালে চিত্র পাল্টেছে। প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে হত্যায় জড়িতদের।

শেরপুরের শ্রীবরদীতে একটি স্টিলের ট্রাঙ্ক থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পচনধরা নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পিবিআই প্রযুক্তির সহায়তায় নিহতের পরিচয় শনাক্ত করে। তিনি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের ডলি আক্তার (৩৫)।

তদন্তে পিবিআই জানায়, মো. নিয়ামুর নাহিদ (২৬) ডলিকে শ্রীপুরের একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। টাকা-পয়সা ও একটি অনৈতিক বিষয় নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে গামছা পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। পরে নাহিদের স্ত্রী রিক্তা মনি (২৬) মরদেহ গোপনে সরানোর কাজে সহযোগিতা করেন। ট্রাঙ্কে ভরে মরদেহটি শ্রীবরদীতে নিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।

নাহিদ ও রিক্তা মনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান। মামলাটি এখনো তদন্তাধীন; চার্জশিট দাখিলের তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

গত ১১ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের জয়দেবপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে একটি খাল থেকে সুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তায় নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পিবিআই পরিচয় শনাক্ত করে জানায়, নিহত ডলি আক্তার (৩০) ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার বাসিন্দা ও পোশাককর্মী।

তদন্তে উঠে আসে, একই কারখানার কর্মী মিশন ইসলাম (২২)-এর সঙ্গে তার প্রায় পাঁচ বছরের সম্পর্ক ছিল। বিয়ে নিয়ে বিরোধের জেরে ৮ সেপ্টেম্বর তাকে মিশনের ভাড়া বাসায় নেওয়া হয়। পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পর লুঙ্গি ও বালিশ দিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়।

মরদেহ সুটকেসে না ঢোকায় বঁটি দিয়ে কোমর থেকে দুই ভাগ করা হয়। এক অংশ সুটকেসে, অন্য অংশ বস্তায় ভরে ফেলা হয়। মিশনের মা বাণু আক্তার (৪৩) ও বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টন (২৪) মরদেহ সরিয়ে ফেলার কাজে সহযোগিতা করেন বলে পিবিআই জানিয়েছে। তিনজনই গ্রেপ্তার এবং ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। উদ্ধার হয়েছে হত্যায় ব্যবহৃত বঁটি, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন, জুতা ও সিসিটিভির আলামত। মামলার তদন্ত চলছে; চার্জশিট এখনো হয়নি।
লাশ গোপনের কৌশল, তদন্তে প্রযুক্তির জবাব : অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তে শারীরিক বর্ণনা, পোশাক, আঘাতের চিহ্ন ও ঘটনাস্থলের আলামত সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে পুলিশের তদন্ত নির্দেশিকাও। আর পিবিআই ব্যবহার করছে বৈজ্ঞানিক, ফরেনসিক ও বায়োমেট্রিক পদ্ধতি।

এক দশকের ঘটনাগুলোয় তাই স্পষ্ট-ঘাতকেরা লাশ গোপন করে পরিচয় মুছে ফেলতে চাইলেও প্রযুক্তির জালে সেই অন্ধকার কৌশল ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। তবে পুরোনো মামলাগুলোর অগ্রগতি অপ্রকাশিত থাকায় প্রশ্নও রয়ে গেছে-সুটকেস, ট্রাঙ্ক কিংবা বস্তায় পাওয়া অজ্ঞাত নারীদের কতজনের পরিচয় মিলেছে, আর কত হত্যার রহস্য এখনো চাপা পড়ে আছে তদন্তের ফাইলের নিচে?


জ/বা




  বিষয়:   অপরাধ  হত্যা  লাশ উদ্ধার 



Advertisement
Loading...
Loading...
অপরাধ - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]