একটি সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় পরিবারের প্রতিটি মুহূর্ত যেন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। কিন্তু সেই অপেক্ষার পরিণতি সবসময় সুখের হয় না। কুমিল্লার সাম্প্রতিক ঘটনাটি তারই নির্মম উদাহরণ।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান অপ্রতিম শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। সন্ধান না পেয়ে ওই রাতেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন পরিবারের সদস্যরা। একই সঙ্গে পরিবার ও পুলিশের পক্ষ থেকে শুরু হয় তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা।
একমাত্র সন্তান নিখোঁজ হওয়ায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় ভেঙে পড়েন মা নাহিদা বেগম। থানায় জিডি করার পাশাপাশি সন্তানের সন্ধান চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন তিনি। পোস্টটি অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সন্তানের সন্ধানে স্বজনদের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
অবশেষে শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের একটি নির্জন স্থান থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একজনকে আটক করেছে।
অপ্রতিমের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হলেও এটি শিশু নিখোঁজের একটি বড় চিত্রকে নতুন করে সামনে এনেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত গত সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজের বিষয়ে জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো ২ হাজার ৩৮ জন শিশু উদ্ধার হয়নি।
গত ৩ সেপ্টেম্বরের এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায় পুলিশ। এতে বলা হয়, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব সংবাদে নিখোঁজ শিশুদের পরবর্তী অবস্থা, অর্থাৎ কতজন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, সে তথ্য উল্লেখ না থাকায় শিশু নিখোঁজের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। এতে এ বিষয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিভ্রান্তি নিরসন ও বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে পুলিশ সদর দপ্তর সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের বিষয়ে ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জনকে এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
একই সময়ে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৯৭০ জন এখনো উদ্ধার হয়নি।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ছোট শিশুরা অনেক সময় পথ হারিয়ে নিখোঁজ হয়। অন্যদিকে কিশোর-কিশোরীদের নিখোঁজের ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহ, অভিমান, পড়াশোনার চাপ এবং বন্ধুদের প্রভাবসহ নানা কারণ সামনে আসে। এসব বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।
জ/রা