ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুরো মেয়াদজুড়ে চলতে পারে। এমনকি ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্টের শপথ নেওয়ার পরও এই সংঘাত অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে বলে ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছেন তার শীর্ষ উপদেষ্টারা। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক চাপ অব্যাহত থাকলেও তেহরান দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। তবে এই মূল্যায়ন ট্রাম্পের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সম্প্রতি তিনি বলেছিলেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের (মিডটার্ম) পরপরই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ওভাল অফিস ও সিচুয়েশন রুমে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও সামরিক কৌশল তেহরানকে চাপে ফেললেও দেশটি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি নতি স্বীকার করবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে সংঘাত ২০২৯ সাল পর্যন্তও গড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে মন্তব্য চাওয়া হলেও হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ট্রাম্পের কৌশলের পক্ষে হোয়াইট হাউস
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন প্রকাশের পর হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করেছেন এবং ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌ অবরোধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতিকে চরম চাপে ফেলেছেন।’ তবে ওই মুখপাত্র আরও বলেন, ট্রাম্প কখন কী করবেন, সে সিদ্ধান্ত একমাত্র তিনিই জানেন।
নির্বাচনের পরই যুদ্ধ শেষ হবে: ট্রাম্প
বুধবার ডালাসে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হবে। তারা আর বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না।’
ট্রাম্পের দাবি, ইরান মার্কিন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের মুখে দেশটির পক্ষে দীর্ঘদিন প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
আলোচনার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি
ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি ট্রাম্প। তবে তিনি জানান, আলোচনা তার প্রথম পছন্দ নয়।
ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, আলোচনা হতে পারে। তবে এটি এমন কিছু নয়, যা আমরা এখন সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছি।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত সপ্তম মাসে প্রবেশ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলাও দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালির কাছে উত্তেজনা
বুধবার ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ডুবিয়ে দেওয়ার পর হরমুজ প্রণালির কাছে তারা ১০টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
এ ছাড়া ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জর্ডানের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে সিবিএস নিউজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ওই হামলায় একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট যুদ্ধবিমান গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানও আংশিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
তেলের দাম ছাড়াল ১০০ ডলার
ইরানকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম বেড়েছে। তবে ট্রাম্পের দাবি, যুদ্ধ শেষ হলে নির্বাচনের পর তেলের দামও দ্রুত কমে আসবে।
রাজনৈতিক চাপেও ট্রাম্প
ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে ট্রাম্পের ওপর। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং যুদ্ধ নিয়ে জনঅসন্তোষের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তার জনপ্রিয়তা রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এটি হোয়াইট হাউসের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ইরান পরাজয়ের কাছাকাছি: নেতানিয়াহু
এদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরান পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
সিরিয়ার মাউন্ট হারমন এলাকায় এক বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরাইল তার সীমান্তের কাছে কোনো ‘সন্ত্রাসী বাহিনীকে’ ঘাঁটি গড়ে তুলতে দেবে না।
তার ভাষ্য, সীমান্তবর্তী এলাকায় শত্রুপক্ষের অবস্থান গড়ে তোলার সুযোগ ঠেকিয়ে দেওয়াই ইসরাইলের অন্যতম বড় অর্জন। তিনি এটিকে ‘পুনরুত্থানের যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
জ/উ