পঞ্চগড় জেলা পরিষদের সদ্য প্রয়াত প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলহাজ্ব তৌহিদুল ইসলামের মৃত্যুর এক সপ্তাহ পার না হতেই নতুন প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে পঞ্চগড়ে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও চরম হতাশা বিরাজ করছে। বিগত স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে নিষ্ক্রিয় থাকা সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এম এ মজিদকে তড়িঘড়ি করে এই পদে নিয়োগ দেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড় জেলা বিএনপির বলিষ্ঠ নেতা, পঞ্চগড় পৌরসভার সাবেক পাচ বারের মেয়র ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আলহাজ্ব তৌহিদুল ইসলাম গত ১ সেপ্টেম্বর বার্ধক্যজনিত কারণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিনের মাথায় ৭ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এম এ মজিদকে জেলা পরিষদের নতুন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই তড়িঘড়ি নিয়োগের খবরটি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ সহ তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
অনেক নেতাকর্মী ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, যিনি বিগত বছরগুলোতে দলের কঠিন সময়ে এবং বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনে রাজপথে ছিলেন না, যার কোনো ভূমিকা দৃশ্যমান ছিল না, তাকে এত দ্রুত কীভাবে মূল্যায়ন করা হলো?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের একাধিক তৃণমূল নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তৌহিদুল ভাই আমাদের অভিভাবক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর শোক এখনো আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। অথচ দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের অবমূল্যায়ন করে আন্দোলন-সংগ্রামে নিষ্ক্রিয় থাকা একজনকে জেলা পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসানো হলো। এতে রাজপথের ত্যাগী কর্মীরা চরমভাবে হতাশ ও অপমানিত বোধ করছেন।
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যখন দলের নেতাকর্মীরা একের পর এক মিথ্যা মামলায় জেল-জুলুমের শিকার হচ্ছিলেন এবং প্রতিনিয়ত রাজপথে বুক পেতে দিচ্ছিলেন, তখন এই নেতার ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নীতিনির্ধারকদের এই সিদ্ধান্তকে তৃণমূলের সেন্টিমেন্টের পরিপন্থী এবং ত্যাগীদের বঞ্চিত করার শামিল বলে মনে করছেন তারা।
জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রোকনুজ্জামান বলেন, এম এ মজিদ সাবেক স্পিকার জমিরউদ্দীন সরকারের এপিএস ছিলেন। এবং তার কৃতকর্মের ফলেই বিগত সরকারের আমলে সাবেক স্পিকারের নামে অনিয়ম দূর্নীতির মামলা হয়েছিলো। তিনি ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টাকা কামানোর পর গা ঢাকা দিয়ে চলতেন। দীর্ঘদিন তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে ছিলেননা। তারমত দূর্নীতিবাজ মানুষকে জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিনা। এই ঘটনায় আমরা তৃণমূল নেতাকর্মীরা ভীষণ হতাশ।
জেলা যুবদলের সভাপতি ফেরদৌস ওয়াহিদ রাসেল বলেন, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তৌহিদুল ইসলামের মৃত্যুর সপ্তাহ না যেতেই জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ আমাদের হতাশ করেছে। বিগত এক এগারো পরবর্তী সময়ে এম এ মজিদ কে আন্দোলন সংগ্রামে পাওয়া যায়নি। ফলে তৃণমূলের সিদ্ধান্ত কে উপেক্ষা করেই দলকে বিতর্কিত করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কিনা সেটাও ভেবে দেখতে হবে।
জেলা জাসাসের আহবায়ক ও সাবেক ছাত্রনেতা ইউনুস শেখ বলেন, জেলা বিএনপির একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তৌহিদুল ইসলামের মৃত্যুর শোক কাটানোর আগেই বিতর্কিত ব্যাক্তিকে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে যা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য নয়। আমরা শুনেছি কেবিনেট সেক্রেটারি নাসিমুল গণির সাথে আতাত করে পঞ্চগড় এক আসনের সাংসদ নওশাদ জমিরের যোগসাজশে বিগত আন্দোলন সংগ্রামে ভুমিকা না থাকা একজন এম এ মজিদ কে জোরপূর্বক প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অথচ জেলা বিএনপির আহবায়ক জাহিরুল ইসলাম কাচ্চু সহ মামলা হামলার স্বীকার অনেক সিনিয়র নেতাদের এর মাধ্যমে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই এবং দ্রুত রাজপথের নেতাদের মূল্যায়ন করে এই পদে দেখতে চাই।
জেলা বিএনপির আহবায়ক জাহিরুল ইসলাম কাচ্চু বলেন, সে কোন আন্দোলনে ছিলনা। এমনকি ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরেও তাকে বিএনপি দলীয় অফিসে দেখা যায়নি। তার কোন জনসমর্থন নেই। সে জামাতে ইসলামের একজন সচিবের সহযোগিতায় তদবির করে এই পদ নিয়েছে।
এদিকে পঞ্চগড়ের তৃণমূল নেতাকর্মীরা এই বিতর্কিত নিয়োগ পুনর্বিবেচনা করার জন্য বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় দলের চেইন অব কমান্ড এবং নেতাকর্মীদের মাঝে বিরাজমান ক্ষোভ আরও প্রকট রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে সদ্য নিয়োগ প্রাপ্ত পঞ্চগড় জেলা পরিষদের প্রশাসক এম এ মজিদের মুঠো ফোনে একাধিকবার ফোন করেও ব্যবহৃত নাম্বার টি বন্ধ থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
জ/বা