আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক সিইডিএডাব্লিউ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, নারীদের ডিজিটাল হয়রানি মোকাবিলায় বাংলাদেশ একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে ঢাকায় একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যার মালিকানা ও উদ্যোগ বাংলাদেশের থাকবে।
শামা ওবায়েদ বলেন, প্রায় তিন মাস আগে সেনেগালে অনুষ্ঠিত ডাকার পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি ফোরামে বাংলাদেশ ‘এন্ডিং ডিজিটাল হ্যারাসমেন্ট অ্যাগেইনস্ট উইমেন : ঢাকা ডায়ালগ’ শীর্ষক উদ্যোগটি উত্থাপন করেছে।
তিনি বলেন, আসন্ন জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে সরকার ঢাকায় এ উদ্যোগের ওপর একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নারীদের ডিজিটাল হয়রানি একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে, যা জাতীয় সীমারেখা অতিক্রম করেছে এবং এর জন্য সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আমি যার সাথেই কথা বলি, প্রতিটি দেশের নারীই একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, যদিও এর মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
শামা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যত মূলধারার তথ্যপরিসরের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীদের লক্ষ্য করে হয়রানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি এ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহযোগিতা কামনা করেন।
প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজ্যুলেশন ১৩২৫-এর আলোকে বাংলাদেশ তৃতীয় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করছে।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে শামা বলেন, সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং যোগ্য নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদে বসানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, এটি একটি সামাজিক সমস্যা। কোনো রাষ্ট্র বা সরকার একা এটি সমাধান করতে পারে না। একটি সামাজিক বিপ্লব হতে হবে।
শামা উল্লেখ করেন, বৈষম্যবিরোধী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়া তরুণদের কেউ কেউ রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও এসব আন্দোলনে যুক্ত তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যক তরুণীকে বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান দেখা যাচ্ছে।
তিনি নারী সংগঠনগুলোকে নারী আইনপ্রণেতাদের সাথে আরো সম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানান এবং নারীর অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব-সংক্রান্ত বিষয়গুলো এগিয়ে নিতে একটি সংসদীয় টিম গঠনের প্রস্তাব দেন।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়ে শামা বলেন, সরকার জেন্ডার বাজেটের আওতায় ৩ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি বরাদ্দ দিয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশের সমান।
তিনি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত নারী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে শিক্ষা, নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রস্তাবিত নারী কল্যাণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নারীর ক্ষমতায়নকে শুধু অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তাদের নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি নারীদের দক্ষ অভিবাসনের ওপর সরকারের গুরুত্বারোপের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বিদেশী ভাষায় দক্ষতা বাংলাদেশী নারীদের মর্যাদার সাথে বিদেশে আরো ভালো কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
শামা বলেন, বাংলাদেশী অভিবাসী কর্মীদের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি পৃথক মাইগ্রেশন উইং এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় ফোকাল টিম গঠন করেছে।
সিইডিএডাব্লিউ বিষয়ে তিনি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আগামী বছর দেশের স্টেট রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হবে।
তিনি সিইডিএডাব্লিউ শ্যাডো রিপোর্ট প্রস্তুতের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, নাগরিক সমাজের স্বাধীন ও গঠনমূলক মূল্যায়ন অর্জন ও ঘাটতি উভয়ই চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারে।
শামা বলেন, নারীদের পেছনে রেখে কোনো দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি কখনোই অর্জন করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ধর্ম, জাতিসত্তা বা অন্যান্য পরিচয় নির্বিশেষে সব নারী সমান অধিকার ভোগ করবেন- সরকার এমনটাই বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের উন্নয়নে নারীদের সমান অংশীদার করতে তিনি নাগরিক সমাজ ও নারী সংগঠনগুলোর সহযোগিতা কামনা করেন।
বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপের বিষয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন অনুমোদন করে। তবে বাংলাদেশ এখনো কনভেনশনের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় সংরক্ষণ বজায় রেখেছে।
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর সিইডিএডাব্লিউ গ্রহণ করে। ১৯৮০ সালের ১ মার্চ কনভেনশনটি স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করা হয় এবং ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এটি কার্যকর হয়। বাংলাদেশ কয়েক বছর পর কনভেনশনটি অনুমোদন করে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ১৯৯১ সাল থেকে সিইডিএডাব্লিউ কনভেনশনের পূর্ণ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে দিবসটি পালন করে আসছে।
জ/রা