সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা দিতে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কের পাশে নির্মাণ করা হয় ট্রমা সেন্টার। উদ্দেশ্য ছিল আহতদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় এনে প্রাণহানি কমানো। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশাসনিক অনুমোদন না থাকায় বছরের পর বছর ধরে এসব সেন্টারের অধিকাংশই কোনো কাজে আসছে না। নতুন নামে ‘অ্যাক্সিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ হিসেবে এগুলো চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের ২৪টি ট্রমা সেন্টার আধুনিকায়ন করে পর্যায়ক্রমে চিকিৎসাসেবা চালু করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে যাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
সূত্র জানায়, গত বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে এসব সেন্টার চালু করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর পর থেকেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কাজ শুরু করেছে।
স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী ট্রমা সেন্টার চালুর বিষয়ে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এসেছে। দ্রুত চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। সেন্টারগুলো আধুনিকায়ন করা হবে। প্রয়োজনীয় জনবল দিয়ে চালু করা হবে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১০টি এবং ২০১০ সালে আরও ১৪টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে মাত্র দুটিতে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগ চালু রয়েছে। একটি সংশ্লিষ্ট জেলা হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলো নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ করে মাথা, বুক, মেরুদণ্ড ও হাড়ে গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীর দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা। তিন তলা ভবনে ২০ শয্যার আইসিইউ ও ৪০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
ট্রমা সেন্টারগুলো নির্মাণে মোট কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সে হিসাব স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দিতে পারেনি। তবে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব সেন্টারের অবকাঠামো নির্মাণে অন্তত ১৪০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার উদ্দেশ্যে টাঙ্গাইলে অত্যাধুনিক ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয় ২০১১ সালে। সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, ভবনটিতে কোনো কার্যক্রমই ট্রমা সেন্টার হিসেবে চলছে না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন কাজে ভবনটি ব্যবহার হচ্ছে। নিচতলায় জরুরি বিভাগ, নাক-কান-গলার (ইএনটি) চিকিৎসা ও ফার্মেসির কার্যক্রম চলছে। দ্বিতীয় তলায় টিকিট কাউন্টার, বহির্বিভাগ ও ল্যাব। তৃতীয় তলায় অস্ত্রোপচার কক্ষ ও অন্তঃসত্ত্বাদের জন্য লেবার রুম।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ট্রমা সেন্টারে কনসালট্যান্ট চিকিৎসক, অর্থোপেডিকস সার্জন, অ্যানেসথেটিস্ট, আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা, নার্স, ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফার, টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় জনবল থাকার কথা। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাদিকুর রহমান বলেন, বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও কোনো জনবল নিয়োগ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়নি। এ কারণে এটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিটি ট্রমা সেন্টারের জন্য সাতজন কনসালট্যান্ট, তিনজন অর্থোপেডিকস সার্জন, দুজন অ্যানেসথেটিস্ট ও দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এ ছাড়া ১০ জন নার্স এবং ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফার, টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন পদে জনবল দেওয়ার কথা।
কিন্তু কোনো সেন্টারেই প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনগুলো পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। কোথাও ভবনের সামগ্রী চুরি হয়েছে, আবার কোনো কোনো ভবনে মাদকসেবীদের আড্ডা বসার অভিযোগও রয়েছে।
পাবনার আটঘরিয়া, বগুড়ার শেরপুর, সিরাজগঞ্জ সদর ও উল্লাপাড়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, গোপালগঞ্জ সদর, মাদারীপুরের শিবচর, মানিকগঞ্জের শিবালয়, শরীয়তপুরের জাজিরা, ফরিদপুরের ভাঙ্গা (মধুখালী), মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর, ঢাকার ধামরাই, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, হাটহাজারী ও রাউজান, কুমিল্লার দাউদকান্দি, ফেনীর মহিপাল, ময়মনসিংহের ভালুকা, সুনামগঞ্জের ছাতক এবং হবিগঞ্জের বাহুবলে ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন সমকালকে বলেন, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা ২৪টি ট্রমা সেন্টার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক-দুই দিনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হবে। আমাদের লক্ষ্য সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষ যাতে ঢাকামুখী না হয়। এলাকায় তাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। স্থানীয়ভাবে যতটুকু সম্ভব চিকিৎসা যেন এসব সেন্টারে পাওয়া যায়, সেটিই লক্ষ্য।
জ/রা