জবাবদিহি ডেস্ক

দেশজুড়ে

2026-09-02T08:45:32+06:00
2026-09-02T08:45:32+06:00
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলা English
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
দেশজুড়ে
বেতন কাঠামো
নতুন পে-স্কেলের ছোঁয়া লাগেনি বেসরকারি খাতে, বাজারের আগুনে পুড়ছেন কোটি কর্মী
জবাবদিহি ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৫ এএম 
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বাড়িয়েছে সরকার। নতুন পে স্কেল শুধু সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়াবে, কিন্তু তা দেশের পুরো শ্রমবাজারের মজুরি কাঠামোয় প্রভাব ফেলবে। কারণ এতে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সংকট, উৎপাদন, বিনিয়োগে স্থবিরতাসহ নানা কারণে বেসরকারি খাতের পক্ষে বেতন বাড়ানো কতটুকু সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। 

এর আগে ২০১৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়। তার প্রভাব নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিপিডির করা গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ার পর বেসরকারি খাতের উচ্চ বেতনভোগীদের একটি অংশ নিজেদের বেতন সমন্বয় করতে পেরেছিল। কিন্তু কম বেতন পাওয়া কর্মীরা সেই সুযোগ পাননি। ফলে সরকারি-বেসরকারি কর্মীদের বেতন ব্যবধানের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভেতরেও বৈষম্যের চাপ তৈরি হয়।

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে একযোগে সব ভাতা কার্যকর হলে বছরে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রায় অর্ধেক। 

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিপুল অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, সরকারকে বাড়তি রাজস্ব আয়ের জন্য মূলত বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে। সেই চাপও বেসরকারি খাতের কর্মীদের ওপর পড়বে। 

বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের একটি অংশ অবশ্য বলছে, বেসরকারি খাতে কোনো একক বেতন কাঠামো নেই। সরকারি পে স্কেলের সঙ্গে বেসরকারি খাতের মজুরি পুনর্গঠনের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। বেসরকারি খাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়মিত বেতন বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়লেও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় হয়নি। আবার কোথাও হয়তো দীর্ঘদিন বাড়েনি। একটি মিশ্র চিত্র রয়েছে।  

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান সমকালকে বলেন, দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক। এর ফলে সৎ কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে। তাঁর মতে, ১৮ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ২৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ানোর কারণে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তবে জনগণের করের টাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে ঘুষ-দুর্নীতি কমা উচিত। 

ফজলে শামীম এহসান বলেন, গত ১১ বছরে তৈরি পোশাক খাতে বেতন ১৩৬ শতাংশ বেড়েছে। অন্যান্য বেসরকারি খাতেও বিভিন্ন হারে বেড়েছে। এ কারণে সরকারি পে স্কেলের সঙ্গে বেসরকারি খাতে বেতন পুনর্গঠনের কোনো সম্পর্ক নেই। 

২০১৫ সালের পর করা ওই গবেষণায় সিপিডি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপের ডেটা ব্যবহার করেছিল। গবেষণা অনুযায়ী, বেতন বৃদ্ধির কারণে সরকারি চাকরি তুলনামূলক আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে বেসরকারি খাত দুধরনের চাপে পড়ে। একদিকে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে কর্মীদের 

বেতন বাড়ানোর দাবি ওঠে। অন্যদিকে সরকারি চাকরির তুলনায় বেতন ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান বেশি হওয়ায় দক্ষ কর্মী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিগত সরকারি বেতন কাঠামোর অভিজ্ঞতা বলছে, সরকারি চাকরির সঙ্গে বেসরকারি খাতের প্রতিযোগিতা তাই শুধু বেতনের নয়; পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ছুটি, চিকিৎসা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, চাকরির নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধাও এর অংশ। সিপিডির গবেষণায় দেখা যায়, এসব বেতনবহির্ভূত সুবিধার আওতাও সরকারি খাতে তুলনামূলক বেশি। এবারের বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের পেনশনও বাড়ানো হয়েছে। 

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও এই পে স্কেল শ্রমবাজারের সিংহভাগজুড়ে থাকা বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় না বাড়লেও খরচ বাড়বে, যা সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।

২০১৫ সালের বেতন কাঠামোর আরেকটি প্রভাব দেখা গিয়েছিল বেসরকারি শিক্ষা খাতে। অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তখন বেতন ও শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি অস্বাভাবিক হারে বাড়াচ্ছিল– এমন অভিযোগের পর সরকার শিক্ষার্থীদের বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ সীমা নির্ধারণ করে দেয়। নতুন বেতন কাঠামো মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরদিন গতকালই এ প্রশ্ন সামনে এসেছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কী হবে?

মঙ্গলবার বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন লেখেন, ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদেরও নতুন বেতন কাঠামোতে বেতন দেওয়া হবে।’ এর আগে গত সোমবার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা নতুন পে স্কেলে অন্তর্ভুক্ত হবেন কিনা— জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবের বক্তব্যের পর এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। দেশের প্রায় সোয়া ছয় লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সংগঠন এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোট দ্রুত নতুন পে স্কেলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারির দাবি জানায়।

ব্যাংক, টেলিকম, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, ভোগ্যপণ্য, উৎপাদন, এনজিও, গণমাধ্যম– এসব খাতে কী হবে, এখনও পরিষ্কার নয়। বড় প্রতিষ্ঠানের কেউ কেউ বাজার ধরে রাখতে বেতন সমন্বয় করতে পারে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য একই হারে বেতন বাড়ানো কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে দুই ধরনের শ্রমবাজার তৈরি হতে পারে। 

নিটওয়্যার শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, বেসরকারি খাতের শিল্পকারখানা এমনিতেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত তিন বছরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। এ অবস্থায় মজুরি বাড়ানো হলে শিল্পমালিকদের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব হবে না। 

তিনি বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী তৈরি পোশাক খাতে ২০২৮ সালের আগে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন বা মজুরি নির্ধারণের আইনগত সুযোগ নেই। ২০২৩ সালে সর্বশেষ মজুরি বোর্ড গঠন করে মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে সময়কার আইনে পাঁচ বছর পর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের বিধান আছে। 

সরকারি কর্মীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কেবল সরকারি কোষাগারের হিসাব নয়। এর প্রভাব পড়বে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ব্যয়, কর্মী ধরে রাখার সক্ষমতা, পণ্যের উৎপাদন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক মজুরি কাঠামোর ওপর।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন সমকালকে বলেন, দুর্বল রাজস্ব আদায়ের মধ্যে সরকার ব্যাংক ঋণ বা নতুন টাকা সৃষ্টির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করলে বেসরকারি বিনিয়োগের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বরাদ্দ কমিয়েও এ ব্যয় মেটানো সমীচীন হবে না। তাই করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং ভর্তুকির যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে অর্থসংস্থান করতে হবে। তিনি মনে করেন, সরকারি খাতে নতুন পে স্কেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি করবে। 

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপানো হলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়বে। আবার ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে সুদের বোঝা বাড়বে। এর ফলে ভবিষ্যতে বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। এমনকি বাজেট বিস্ফোরণের ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে। 

জাহিদ হোসেন বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বেসরকারি খাত এমনিতেই খারাপ অবস্থায় রয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর বিশাল ব্যয়ের চাপে সরকার যদি ভর্তুকি পরিশোধে দেরি করে, তাহলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে। এতে বেসরকারি খাতসহ দেশের ১৮ কোটি মানুষের জীবনযাত্রা আরও সংকটের মুখে পড়বে। তাই সুষ্ঠু আর্থিক ও অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে নতুন পে স্কেল সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও সরকারের নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তারা নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাবেন। গতকাল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ তথ্য জানান। 

এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী এক বিবৃতিতে বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা পেয়ে আসছেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির পর এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদেরও নবম পে স্কেলের আওতায় এনে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে, এমন প্রত্যাশা করেন তিনি। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা এতদিন সরকার থেকে মূল বেতনের পাশাপাশি মাসে এক হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া ও ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পেয়ে আসছিলেন। তবে সম্প্রতি শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলনের পর বাড়ি ভাড়া ও ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

জ/রা
 




  বিষয়:   সরকারি চাকরিজীবী  বেতন বৃদ্ধি  পে স্কেল 



Advertisement
Loading...
Loading...
দেশজুড়ে - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]