দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গৃহবধূদের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা যেন থামছেই না। কখনো নিজ ঘরে ঝুলন্ত অবস্থায়, কখনো বন্ধ বাসায়, আবার কখনো পুকুর-নদী কিংবা নির্জন স্থান থেকে মিলছে নারীর মরদেহ। কোনো ঘটনায় স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ উঠছে, আবার কোথাও প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলা হলেও পরে পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার সন্দেহ করা হচ্ছে। ফলে মরদেহ উদ্ধারের পর প্রকৃত মৃত্যুর কারণ নির্ধারণই অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সা¤প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে এনেছে। গত ২৩ আগস্ট জামালপুর শহরের পাঁচরাস্তা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে ইসরাত জাহান নামে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই বাসার অন্য কক্ষে আটকে থাকা তাঁর দুই শিশুসন্তানকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর তাঁর সঙ্গে থাকা কাওসার আহমেদ শাওন পালিয়ে যান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়। পরে তদন্তে ঘটনাটির প্রাথমিক বর্ণনাতেও পরিবর্তন আসে; পিবিআইয়ের তদন্তে নিহত নারী ও শাওনের সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন তথ্য সামনে আসে।
এর কয়েক দিন আগে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পুলিশ প্রথমে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যার কথা জানালেও স্বজনদের পক্ষ থেকে সেই বয়ান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পরে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি থানা থেকে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সরকারি হিসাবে নেই ‘গৃহবধূ মৃত্যুর’ আলাদা চিত্র: দেশে গৃহবধূদের মৃত্যু নিয়ে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ হলেও পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানে ‘গৃহবধূ’ হিসেবে আলাদা কোনো শ্রেণি না থাকায় দেশব্যাপী এ ধরনের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া কঠিন। ফলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর, মামলা এবং মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যই পরিস্থিতির একটি সামগ্রিক চিত্র দেয়।
তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০২৪ সালের নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা জরিপের তথ্য পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে কোনো না কোনো সময় ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গত এক বছরেও এমন সহিংসতার মুখে পড়েছেন প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী। নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ, মানসিক, শারীরিক, যৌন ও অর্থনৈতিক সহিংসতার বিভিন্ন রূপ এতে অন্তর্ভুক্ত।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সহিংসতার শিকার ৬৪ শতাংশ নারী বিষয়টি কাউকে জানাননি। পরিবার ভেঙে যাওয়ার ভয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, সামাজিক মর্যাদা এবং সহিংসতাকে ‘পারিবারিক ব্যাপার’ হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতাই নীরবতার অন্যতম কারণ বলে জরিপে উঠে এসেছে।
যৌতুক-নির্যাতনেও প্রাণহানি: নারীর মৃত্যুর ঘটনায় যৌতুকের অভিযোগও বারবার সামনে আসছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংবাদপত্রে প্রকাশিত যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতার ঘটনায় বহু নারী নিহত হয়েছেন; সংগঠনটির সংকলনে শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যা এবং নির্যাতনের পর আত্মহত্যার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
২০২৬ সালেও আসক নিয়মিতভাবে পারিবারিক ও যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতার তথ্য প্রকাশ করছে। জানুয়ারি-জুলাই সময়ের জন্য সংগঠনটির পৃথক প্রতিবেদন রয়েছে, যা দেখায়—পারিবারিক পরিসরে নারীর ওপর সহিংসতা এখনো একটি ধারাবাহিক সমস্যা।
ঝুলন্ত মরদেহ মানেই আত্মহত্যা নয়: গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর অনেক সময় স্বাভাবিকভাবেই আত্মহত্যার ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহ পাওয়া গেলেই মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। দড়ি বা কাপড়ের ধরন, গিঁটের অবস্থান, শরীরের আঘাত, ঘরের ভেতরের আলামত, সংগ্রামের চিহ্ন, দরজা-জানালার অবস্থা এবং মৃত্যুর আগে-পরের যোগাযোগ, সবকিছুই বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ময়নাতদন্তের পাশাপাশি মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং পারিবারিক বিরোধের ইতিহাসও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। রংপুরের চার হত্যার ঘটনায় প্রাথমিক বয়ান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তদন্তের পরিধি বাড়ানোর ঘটনাই দেখিয়েছে, প্রথম ধারণা সবসময় শেষ সত্য নাও হতে পারে।
ঘরই যখন নিরাপদ নয়: নারীর জন্য সবচেয়ে পরিচিত ও নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত ঘরেই যদি নির্যাতন, হত্যা কিংবা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে, তাহলে বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়—সামাজিক সংকটেরও। পারিবারিক বিরোধ, স্বামী-স্ত্রীর কলহ, যৌতুক, পরকীয়া, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন অনেক ঘটনার পেছনে ভ‚মিকা রাখছে বলে স্বজনদের অভিযোগে উঠে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো নারী মৃত্যুর আগে নির্যাতনের শিকার ছিলেন কি না, স্থানীয়ভাবে সালিশ হয়েছে কি না, তিনি কারও কাছে অভিযোগ করেছিলেন কি না—এসব তথ্যও তদন্তে গুরুত্ব পাওয়া উচিত। একই সঙ্গে আত্মহত্যা হলে তার পেছনে কী ধরনের পারিবারিক ও সামাজিক চাপ কাজ করেছে, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
নারীর মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন দ্রæত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ঘটনাস্থলের বৈজ্ঞানিক আলামত সংরক্ষণ, সময়মতো ময়নাতদন্ত এবং অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা। নইলে কখনো ‘আত্মহত্যা’, কখনো ‘পারিবারিক কলহ’, আবার কখনো ‘অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু’র আড়ালে প্রকৃত সত্য চাপা পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
জ/বা