বন্য প্রাণী উদ্ধার করে সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেওয়াকে সাধারণত সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়। তবে উপযুক্ত আবাসস্থল, পর্যাপ্ত খাবার ও একই প্রজাতির প্রাণীর উপস্থিতি বিবেচনা না করে প্রাণী অবমুক্ত করা হলে সেই বনই তাদের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠতে পারে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা বেঙ্গল লজ্জাবতী বানর নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, লাউয়াছড়ায় অবমুক্ত করা নয়টি লজ্জাবতী বানরের মধ্যে ছয় মাসের বেশি সময় টিকে ছিল মাত্র দুটি। মারা যাওয়া সাতটি বানরের চারটির দেহে একই প্রজাতির অন্য বানরের আক্রমণের চিহ্ন পাওয়া যায়।
চলতি বছর আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন’-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের গবেষক হাসান আল-রাজির নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি আরও ১০ জন গবেষক এতে অংশ নেন। গবেষণাটিতে বন বিভাগসহ বাংলাদেশ, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল।
বন বিভাগ বিভিন্ন সময়ে শিকারি, ব্যবসায়ী, পোষা প্রাণীর মালিক এবং মানুষের বসতবাড়ির বাগান থেকে লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করে। বনে অবমুক্ত করার আগে এসব প্রাণীর ওজন, আঘাত ও অসুস্থতার লক্ষণ পরীক্ষা করা হয়। যেসব বানরের ওজন কম, সেগুলো সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত জানকিছড়া বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে রাখা হয়।
এরপর ক্যামেরার সাহায্যে বানরগুলোর রাতের চলাফেরা, খাবার গ্রহণ এবং আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মোট নয়টি বানরকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা হয়।
এর মধ্যে পাঁচটি বানরকে জানকিছড়া এলাকার কাছাকাছি এবং চারটিকে অন্য এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রতিটির গলায় বেতার সংকেত শনাক্তকারী কলার পরিয়ে আট মাসে মোট ১৩৮ রাত তাদের অবস্থান ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা।
গবেষণার তথ্য বলছে, নয়টি বানরের মধ্যে তিনটি বনে ছাড়ার ১০ দিনের মধ্যেই মারা যায়। আরও চারটি এক মাসের বেশি সময় বেঁচে থাকলেও পরে মারা যায়। ‘অনু’ নামের একটি পুরুষ বানর ১৭৯ দিন পর সংঘর্ষে মারা যায়।
অন্যদিকে ‘ডারউইন’ ও ‘নিশাত’ নামের দুটি বানর ছয় মাসের বেশি সময় বেঁচে ছিল।
মারা যাওয়া সাতটি বানরের মধ্যে চারটির দেহ পরীক্ষার উপযোগী অবস্থায় পাওয়া যায়। সেসব বানরের মাথা, মুখ অথবা আঙুলে অন্য লজ্জাবতী বানরের আক্রমণের চিহ্ন ছিল। বাকি তিনটির দেহ পচে যাওয়ায় মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে সাতটি বানরই অন্য লজ্জাবতী বানরের আক্রমণে মারা গেছে-এমন সিদ্ধান্ত গবেষকেরা দেননি।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, জানকিছড়া কেন্দ্রের কাছাকাছি যে পাঁচটি বানরকে অবমুক্ত করা হয়েছিল, তাদের একটিও টিকে থাকেনি। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ওই এলাকায় মোট ১৯টি লজ্জাবতী বানর অবমুক্ত করা হয়েছিল।
গবেষকদের ধারণা, একই এলাকায় বারবার লজ্জাবতী বানর ছেড়ে দেওয়ার ফলে ওই এলাকায় প্রাণীর ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে খাবার ও বসবাসের এলাকা নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান গণমাধ্যমকে বলেন, দেখতে শান্ত হলেও লজ্জাবতী বানর নিজেদের বসবাসের এলাকা নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। আগে থেকেই কোনো এলাকা দখলে থাকা প্রাণীর মুখোমুখি হলে নতুন করে সেখানে ছাড়া বানর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, মারা যাওয়া কয়েকটি বানর তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক ও আক্রমণাত্মক আচরণ করেছিল। গবেষকদের মতে, এ ধরনের আচরণ দীর্ঘস্থায়ী চাপ এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারার ইঙ্গিত হতে পারে।
গবেষক হাসান আল-রাজি গণমাধ্যমকে বলেন, বন্য প্রাণী উদ্ধারের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে শুধু লোকদেখানো কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। যে যার মতো প্রাণী অবমুক্ত করছেন। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করাই তাদের গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য।
গবেষকেরা মনে করেন, কোনো প্রাণীকে বনে অবমুক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু বনটি ঘন বা সবুজ কি না, তা বিবেচনা করলেই হবে না। সেখানে একই প্রজাতির কতগুলো প্রাণী রয়েছে, বসবাসের জন্য খালি এলাকা আছে কি না, পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যাবে কি না এবং নিরাপদে চলাচলের সুযোগ রয়েছে কি না-এসব বিষয়ও আগে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ জন্য প্রাণী অবমুক্তির আগে সম্ভাব্য এলাকায় ওই প্রজাতির প্রাণীর সংখ্যা ও চলাচল নিয়ে জরিপ, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রাণীটির উৎস শনাক্তকরণ, প্রজাতিভিত্তিক পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হাবিবুন নাহার গণমাধ্যমকে বলেন, বনে ছাড়ার আগে প্রাণীকে আধা প্রাকৃতিক বেষ্টনীতে রেখে তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এতে সময় ও অর্থ ব্যয় হলেও দেশে এ ধরনের চর্চা প্রায় নেই।
বন বিভাগের বন সংরক্ষক (বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল) মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন। তবে তিনি জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদের ঘাটতি রয়েছে।
বন্য প্রাণী গবেষকদের মতে, কোনো প্রাণীকে বনে ছেড়ে দেওয়ার ছবি ধারণ করেই সংরক্ষণ কার্যক্রমের সফলতা নিশ্চিত হয় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে অবমুক্ত প্রাণীটি নতুন পরিবেশে কতটা টিকে থাকতে এবং তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে, তার ওপর।
জ/উ