খন্দকার হানিফ রাজা

আইন-আদালত

2026-08-29T19:01:21+06:00
2026-08-29T19:01:21+06:00
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
বাংলা English
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
Advertisement
আইন-আদালত
জামিনের পরও মুক্তি নয়, নতুন মামলায় আসামি
বিচারের আগেই দীর্ঘ কারাবাস, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের অভিযোগ
প্রবীণ বন্দিদের মৃত্যু ও চিকিৎসাবঞ্চনা নিয়ে প্রশ্ন
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:০১ পিএম 
বিচার শুরুর আগেই বছরের পর বছর কারাগারে বন্দী। কারও বিরুদ্ধে এখনো অভিযোগ গঠন হয়নি, কেউ আদালত থেকে জামিন পেয়েও নতুন মামলায় আটকে যাচ্ছেন। আবার গুরুতর অসুস্থ প্রবীণ বন্দিদের চিকিৎসা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদ, সাবেক কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও অন্যদের আটকের ঘটনাকে ঘিরে এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
 
গত ২৩ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের হাজারো নেতা-কর্মী ও সমর্থককে আটক করা হয়। এ ছাড়া রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন—এমন ব্যক্তিদেরও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলায় জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে শত শত ব্যক্তি এখনো কারাগারে রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ গঠন হয়নি। সাবেক সরকারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও দৃশ্যমান প্রমাণ ছাড়া শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে দীর্ঘদিন আটক রাখা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বদলায় সরকার, বদলায় না আটক সংস্কৃতি: রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রতিপক্ষকে মামলায় জড়িয়ে দীর্ঘদিন আটকে রাখার অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। এবারও সেই পুরোনো চিত্র ফিরে এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘদিন আটক ব্যক্তিদের আইনজীবীদের দাবি, জামিনের আবেদন করলে অনেক ক্ষেত্রে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আশঙ্কা থাকে। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার বদলে মামলার পর মামলা যুক্ত হয়ে আটক দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের পরিচালক এলাইন পিয়ারসন বলেন, এক সরকারের পর আরেক সরকারের আমলে বিরোধীপক্ষের শত শত সদস্যকে কোনো প্রমাণ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধীদের দীর্ঘদিন ইচ্ছেমতো আটকে রাখার অবসানই সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত।

সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৬ সালের ফেব্রয়ারি থেকে অন্তত ১০ জন আওয়ামী লীগ নেতা কারাগারে মারা গেছেন। তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ ছিল না বলেও দাবি করা হয়েছে।

জামিনেও মিলছে না মুক্তি: সাবেক প্রধান বিচারপতি ৮২ বছর বয়সী এ বি এম খায়রুল হককে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়। পরে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরকসহ মোট নয়টি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একাধিকবার জামিনের সুযোগ তৈরি হলেও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোয় তাঁর মুক্তি আটকে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯ আগস্ট তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নতুন মামলা এবং জামিনের পরও মুক্তি না পাওয়ার ঘটনায় বিচারিক আদেশের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা দ্রুত যাচাই করে বিচার শেষ করার বদলে মামলার সংখ্যা বাড়তে থাকলে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা আরও বাড়তে পারে।

ট্রাইব্যুনালে ১৬০-এর বেশি আটক: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আটক ব্যক্তিদের নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালে আটক ১৬০ জনের বেশি ব্যক্তির কাউকেই এখন পর্যন্ত জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়নি। অথচ অভিযোগ গঠন ছাড়াই এক বছরের বেশি সময় আটক রাখার সুযোগ কেবল ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে’ থাকার কথা। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ৮১ বছর বয়সী তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ২২ মাস ধরে অভিযোগ গঠন ছাড়াই কারাগারে আছেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তিনি জামিন চাইলেও তা মঞ্জুর হয়নি; শুনানিও একাধিকবার পিছিয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য ৭৫ বছর বয়সী কামাল আহমেদ মজুমদারও প্রায় ২২ মাস ধরে আটক। পরিবারের দাবি, কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁর পায়ে গ্যাংগ্রিন হওয়ায় তিনটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছে। পরে পড়ে গিয়ে তাঁর কোমরের হাড়ও ভেঙেছে। জুলাইয়ে তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করা হয়। এ ছাড়া ৭৫ বছর বয়সী শাহরিয়ার কবিরের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা ও হুইলচেয়ারের প্রয়োজন এবং ৭১ বছর বয়সী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর গুরুতর হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কারাগারে মৃত্যু, চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন: বন্দি অবস্থায় কয়েকজন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে। ৮৫ বছর বয়সী সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রয়ারি কারাগারে মারা যান। পরিবারের অভিযোগ, তিনি যথাযথ ওষুধ পাননি এবং জামিনও নাকচ করা হয়েছিল।

জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এস এম জিয়াউল হক জিয়া ৬ জানুয়ারি আটক হওয়ার সময় অসুস্থ ছিলেন। জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর ১৪ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। এসব ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা, চিকিৎসা এবং মৃত্যুর কারণ স্বাধীনভাবে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

বিচার-পূর্ব আটক কতটা বৈধ: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বিচার-পূর্ব আটক পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। তবে এটিকে নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম হিসেবে দেখার কথা। পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, প্রমাণ নষ্ট বা সাক্ষীকে প্রভাবিত করার মতো নির্দিষ্ট ঝুঁকি থাকলে ব্যক্তিভেদে আটক রাখার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করতে হয়। বিকল্প হিসেবে জামিন বা শর্তসাপেক্ষ মুক্তির বিষয়ও বিবেচনা করা উচিত।

এ বিষয়ে এলাইন পিয়ারসন বলেন, অভিযোগ গঠনের আগে প্রবীণ ব্যক্তিদের কারাগারে মৃত্যু হলে বোঝা যায়, বিচার-পূর্ব আটককে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

এদিকে নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের বর্তমান রূপ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের আশঙ্কা, আইনটি বর্তমান অবস্থায় পাস হলে নির্বিচার গ্রেপ্তারের অভিযোগ তদন্তে কমিশনের কার্যকর ভ‚মিকা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন—২০২৪ সালের আন্দোলনে হত্যা, গুম, নির্যাতনসহ গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচার, চিকিৎসা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। বিচার যেন প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয় এবং অভিযোগ গঠন ছাড়াই কারাবাস যেন বিচারের বিকল্পে পরিণত না হয়, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা।

জ/বা





  বিষয়:   আইন আদালত  বিচার  রাজনীতি  মামলা  আসামি 



Advertisement
Loading...
Loading...
আইন-আদালত - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]