চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন (সালমান শাহ) হত্যা মামলায় গ্রেফতার খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান গত ২০ আগস্ট ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আসামির উপস্থিতিতে ওই আবেদনের শুনানির জন্য ২৭ আগস্ট দিন ধার্য করেছিলেন আদালত।
গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেফতার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং একই দিন কারাগারে পাঠানো হয়। ১২ আগস্ট সিএমএম আদালতে তার জামিন আবেদন করা হলে তা নামঞ্জুর হয়। এরপর ২৫ আগস্ট দায়রা আদালতও তার জামিন আবেদন নাকচ করেন।
সালমান শাহর মৃত্যুর মামলা
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ। তার মৃত্যুর ঘটনায় তখন অপমৃত্যুর মামলা করেন বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী।
পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ তুলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি। অপমৃত্যুর মামলার সঙ্গে হত্যার অভিযোগও একসঙ্গে তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত।
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় সিআইডি। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেন। তবে সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমানের বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন।
সবশেষ গত ২০ অক্টোবর বাদীপক্ষের করা রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় মামলাটি করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর। মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন-শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ।
মামলার অভিযোগে যা বলা হয়েছে
মোহাম্মদ আলমগীরের করা মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার বোন নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), বোনের স্বামী কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহর সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমিয়ে আছেন।
কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমানের কিছু হয়েছে বলে জানান। এরপর তারা দ্রুত বাসায় ফিরে দেখেন, শয়নকক্ষে সালমান নিথর অবস্থায় পড়ে আছেন। কয়েকজন বহিরাগত নারী তখন তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন। পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
সালমানের মা চিৎকার করে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে পরিবারের সদস্যরা সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পান বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে।
পরে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, সালমান শাহ অনেক আগেই মারা গেছেন।
তদন্ত ও লাশ উত্তোলনের উদ্যোগ
ছেলের মৃত্যুকে হত্যা বলে সন্দেহ করে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করেন কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী। আবেদনে রমনা থানার অপমৃত্যুর মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ এবং সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়।
এর আগে হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সালমান শাহর মৃতদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে ২০ মে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরে ২৪ মে লাশ উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্নের অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে বাদীপক্ষ লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করলে আদালত সেটি নথিভুক্ত করেন। পরে গত ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত আদেশের অনুলিপি আদালতে দাখিল করা হলে সেটিও নথিভুক্ত করা হয়। মামলাটিতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৩০ আগস্ট দিন ধার্য রয়েছে।
জ/উ