১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত ইতিহাস নিয়ে রাজধানীতে আয়োজিত একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা তুলে না ধরায় সমালোচনা করেছেন দর্শনার্থী ও বিশ্লেষকেরা।
রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে ‘জুলাই এখনও শেষ হয় নাই’ শিরোনামে চার দিনব্যাপী এ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। গতকাল ছিল প্রদর্শনীর শেষ দিন। সরেজমিনে গিয়ে বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়।
প্রদর্শনীতে দেশভাগ আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, একনায়কতন্ত্র, সামরিক স্বৈরশাসন, ফ্যাসিবাদ এবং সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে শতাধিক আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে। তবে তৎকালীন জামায়াত নেতাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কোনো ছবি প্রদর্শনীতে রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন দর্শনার্থী ও বিশ্লেষকেরা।
অবশ্য মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন চিত্র আলোকচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ওই সময়কার বিভিন্ন বৈঠকের সচিত্র প্রতিবেদনও প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে।
শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন পর্যন্ত বিভিন্ন আলোকচিত্র প্রদর্শন করা হলেও সেখানে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কোনো চিত্র রাখা হয়নি। একই সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কোনো আলোকচিত্র এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলের কোনো ছবি প্রদর্শনীতে রাখা হয়নি।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ জামায়াতের এ উপস্থাপনাকে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির বিতর্কিত ভূমিকা আড়াল করতেই ১৯৭১ সালের নয় মাসের ইতিহাসের ওই অংশ প্রদর্শনীতে তুলে ধরা হয়নি।
দর্শনার্থীদের প্রতিক্রিয়া
প্রদর্শনী ঘুরে দেখা এক দম্পতি বলেন, ‘যদি জামায়াত ইতিহাস বিকৃত করে তাহলে তাদেরও ইতিহাস থেকে ফেলে দেবে এ দেশের সচেতন জনসাধারণ।’
স্বামীর সঙ্গে প্রদর্শনী দেখতে আসা মুসফিকা তাসনীম বলেন, ‘আলোকচিত্রে কেন এসব ইতিহাস নেই তা জামায়াত ভালো বলতে পারবে। এতে আমরা হতাশ হয়েছি। আবার একটু খুশি হয়েছি যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানকে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এত দিন শুনেছি জামায়াত শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগবিরোধী। অবশ্য ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে দলটি এসব বাদ দেয়নি।’ তবে প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত ইতিহাসকে তিনি অসম্পূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।
জামায়াতের বক্তব্য
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে জামায়াতকে কেন আড়াল করা হয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘একটি প্রদর্শনীতে সবকিছু তুলে ধরা যায় না। এতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জুলাই আন্দোলনকে। তাই ইতিহাসের অনেক কিছু আসেনি। কেবল যেসব বিষয় প্রাসঙ্গিক সেগুলো এসেছে।’
মুক্তিযোদ্ধা ও বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া
জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত আমাদের গুলি করেছে। তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এ দেশটাকে তারা চায়নি। যুদ্ধে আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে, পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছে।’
জামায়াতকে ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দলটি বারবার রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছে কিন্তু তাদের চরিত্র পাল্টায়নি। তারা সাপের মতো এবং মুনাফেক। ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে। আওয়ামী লীগ করেছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। মূলত আওয়ামী লীগ ও জামায়াত মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। জামায়াতের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
মুক্তিযোদ্ধা ও বিশ্লেষক মফিদুল হক বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে গণহত্যা হয়েছিল, সেটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ। এটা বাদ দিয়ে কেউ ইতিহাসের বয়ান দিতে পারে না। আর এটা বলতে গেলে জামায়াতকে নিশ্চয় তাদের অবস্থানটা সুস্পষ্ট করতে হবে। এভাবে জামায়াত যদি মূল জায়গাতেই বিকৃত বয়ান হাজির করতে চায়, তাহলে তাদের পুরো রাজনৈতিক ইতিহাসে নিশ্চয় সেটার প্রতিফলন থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় যে গণহত্যা হয়েছে তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায়। আমরা তো সেটাকে কোনোভাবেই ভুলে যেতে পারি না। কোনো রাজনৈতিক দল যদি সেটা মুছে ফেলার বা বিকৃত করার চেষ্টা চালায়, তাহলে আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না।’
যেভাবে ইতিহাস উপস্থাপন করা হয়েছে
সরেজমিনে প্রদর্শনীতে দেখা যায়, ‘আজাদী : অতঃপর স্বপ্নভঙ্গ’ শিরোনাম দিয়ে ইতিহাসের উপস্থাপনা শুরু করা হয়েছে। সেখানে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পরিকল্পনা নিয়ে অনুষ্ঠিত পাঁচটি বৈঠকের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এর পরের অংশে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ছবি রয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবি ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মোট ১২টি আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে।
এর পরের অংশে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলকে ‘একনায়কতন্ত্র’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। চতুর্থ অংশে এইচ এম এরশাদের আমলকে ‘সামরিক স্বৈরশাসক’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এরপর ১৮টি আলোকচিত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনার শাসনামল তুলে ধরা হয়েছে। ওই অংশের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘ফ্যাসিবাদ’। সবশেষে আলোকচিত্রের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থান তুলে ধরা হয়েছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রদর্শনীতে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়কে ব্যাখ্যা করতে ১৯৪৭, ১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৯০, ২০০৯ ও ২০২৪ সালকে আলাদা করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
১৯৪৭ সাল সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘স্বাধীনতা এলো, রাষ্ট্র বদলাল না। জুলুমবাজ আইয়ুব ও ইয়াহিয়া খানের উত্থান হলো।’
১৯৭১ সাল নিয়ে বলা হয়েছে, ‘দেশ স্বাধীন হলো, রাষ্ট্র বদলাল না। একনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থান হলো।’
১৯৭৫ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘একনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের পতন হলো, রাষ্ট্র বদলাল না।’
১৯৯০ নিয়ে বলা হয়েছে, ‘গণ অভ্যুত্থানে একনায়ক এরশাদের পতন হলো, রাষ্ট্র বদলাল না।’
২০০৯ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘নতুন সরকার এলো, রাষ্ট্র বদলাল না। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার উত্থান হলো।’
২০২৪ সাল সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান হলো। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন হলো। আবার ফ্যাসিবাদ?’
‘জুলাই এখনও শেষ হয় নাই’
প্রদর্শনীর শেষ অংশে ‘আমাদেরকে পারতেই হবে, জুলাই এখনও শেষ হয় নাই’ শিরোনামে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত একটি অসমাপ্ত বিপ্লবের ইতিহাস। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে প্রতিটি সংগ্রাম একেকটি নতুন স্বপ্নের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রকাঠামো ও সংবিধানের মৌলিক সংস্কার না হওয়ায় বারবার ফিরে এসেছে ফ্যাসিবাদ ও একদলীয় কর্তৃত্ববাদ। ২০২৪-এর জুলাই গণ অভ্যুত্থান সেই চক্র ভাঙার মোক্ষম সুযোগ।’ এর পরই প্রশ্ন রাখা হয়েছে, ‘আমরা কি পারব?’
জ/উ