জবাবদিহি ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

2026-03-30T18:23:19+06:00
2026-03-30T18:23:19+06:00
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলা English
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
আন্তর্জাতিক
এবার এনপিটি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত ইরানের
জবাবদিহি ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬, ৬:২৩ পিএম 
একসময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি একটি ধর্মীয় ফতোয়ার মাধ্যমে পরমাণু অস্ত্র তৈরি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে এই ফতোয়াকেই তেহরানের পারমাণবিক নীতির নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক সামরিক চাপ, চলমান যুদ্ধ এবং ইরানের ভেতরে বদলে যাওয়া জনমত নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে— তাহলে কি শেষ পর্যন্ত পরমাণু অস্ত্রের পথেই হাঁটছে কোণঠাসা ইরান? দেশটি এরই মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়েও তৎপরতা শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ২০২৫ সালের মে মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪০৮ দশমিক ৬ কেজি ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে। এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম আরও কিছুটা সমৃদ্ধ করা গেলে অন্তত ৯টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির মতো উপাদান পাওয়া সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য হুমকি এবং ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলার পর ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে কট্টরপন্থিদের প্রভাব দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। তাদের একটি অংশ মনে করছে, অতীতের সেই ধর্মীয় ফতোয়া বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় আর কার্যকর নয়।

শুধু ক্ষমতার বলয়েই নয়, সাধারণ জনমতের ভেতরেও ধীরে ধীরে পরমাণু অস্ত্রের পক্ষে সমর্থন বাড়ছে। বিশেষ করে এক মাসব্যাপী সংঘাতের পর দেশটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ট্রিটা পার্সি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘পরমাণু ফতোয়া এখন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।’

ইউরেনিয়াম মজুতের পাশাপাশি ইরানের সামরিক সক্ষমতাও পশ্চিমা বিশ্বকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশটির হাতে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি তেহরানের দীর্ঘদিনের সমর্থন পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য বাড়তি নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির নেতা কিম জং উন ইরানের পরিস্থিতি টেনে উল্লেখ করছেন, তার দেশের পারমাণবিক অস্ত্র ধরে রাখার সিদ্ধান্তই ছিল সঠিক।

তার ভাষায়, ইরান যুদ্ধ প্রমাণ করেছে পারমাণবিক অস্ত্রই একটি দেশের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি। যার কাছে বোমা আছে, তার ওপর হামলার আগে সবাই দুবার ভাববে।

গত বছরের জুনে ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার, পরমাণু বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা নিহত হন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় দেশটির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

এর পর থেকেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে শুরু করে। এক মাসের সংঘাতের পর ইরানের ভেতরে জনমত দ্রুত পরিবর্তিত হয় এবং পরমাণু অস্ত্রের পক্ষে সমর্থন বাড়তে থাকে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল, প্রয়োজনে তারা তাদের পরমাণু নীতি বদলাতে প্রস্তুত। ২০২৪ সালে সংশ্লিষ্ট কমান্ডার আহমাদ হাকতালাব বলেছিলেন, ‘ইরানের পরমাণু নীতি বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে— এবং তা বাস্তবে করে দেখানো সম্ভব।’

ইতিহাস অবশ্য অন্য একটি দিকও মনে করিয়ে দেয়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বহু চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও হামলার পরও আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সরাসরি কখনো পরমাণু অস্ত্র তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।

বিশেষজ্ঞরা এই নীতিকে বলেন ‘কৌশলগত ধৈর্য’, অর্থাৎ ধাপে ধাপে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার খুব কাছাকাছি পৌঁছানো, কিন্তু শেষ সীমা অতিক্রম না করা।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক রমেশ ঠাকুর, যিনি একসময় জাতিসংঘের হয়ে ইরান ইস্যুতে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন, বলেন, ‘ইরানের জন্য এখন পারমাণবিক অস্ত্রই টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। তারা কেন এটা তৈরি করবে না?’

পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়েও তৎপরতা শুরু হয়েছে ইরানে। কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনা, ইস্পাত কারখানা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হামলার কারণে এনপিটি চুক্তিতে থাকা ‘অর্থহীন’ হয়ে পড়েছে।

গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাতে ইরানের সংসদীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (আগে টুইটার) বলেন, ‘এই আন্তর্জাতিক চুক্তির অংশ হয়ে থাকা এখন আমাদের জন্য কোনো কাজে আসছে না।’

এদিকে ইরানের সংসদে ইতোমধ্যে এ বিষয়ে একটি জরুরি বিল জমা দেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত পর্যালোচনার জন্য তোলা হবে বলে জানিয়েছেন আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি মালেক শারিয়াতি। প্রস্তাবিত এই বিলে এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির সব বিধিনিষেধ বাতিল করার কথা বলা হয়েছে।

পাশাপাশি এনপিটির বদলে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) ও ব্রিকসের মতো বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তির উন্নয়নে নতুন চুক্তির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে এই বিল সংসদে পাস হলেও তা কার্যকর করতে ইরানের ক্ষমতাধর গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে ইরানের বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

এনপিটির মূল উদ্দেশ্য সদস্য দেশগুলোকে শান্তিপূর্ণভাবে পরমাণু শক্তি ব্যবহারে সহায়তা করা হলেও ইরানের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন বলে দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তেহরানের অভিযোগ, এই চুক্তির সদস্যপদ ইরানের জন্য কোনো সুবিধা বয়ে আনেনি; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘গোয়েন্দাগিরির হাতিয়ারে’ পরিণত হয়েছে।

এছাড়া জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে শত্রুপক্ষ ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু স্থাপনাগুলোতে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসিকে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পুতুল’ হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র সমালোচনা করেছে তেহরান।

হরমুজ প্রণালির পর ওমান উপসাগরও নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি ইরানেরহরমুজ প্রণালির পর ওমান উপসাগরও নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি ইরানের
এর আগে গ্রোসি বলেছিলেন, একটি পারমাণবিক বোমা হামলায় ইরানের সব পরমাণু স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তার এ মন্তব্যকে ‘লজ্জাজনক’ ও ‘নির্মম’ অভিহিত করে ইরান বলেছে, তিনি পরোক্ষভাবে ইরানে পারমাণবিক হামলার অনুমোদন দিয়েছেন।

পরমাণু বিশেষজ্ঞ ডেভিড অলব্রাইটের একটি পুরনো বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে তাসনিমের প্রতিবেদনে। অলব্রাইট দাবি করেছিলেন, আইএইএ পরিদর্শকেরা মূলত ‘যুক্তরাষ্ট্রের পদাতিক বাহিনী’ হিসেবে কাজ করেন। 

এই মন্তব্যের সূত্র ধরে ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করে চলা সংস্থার চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ’। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এনপিটি চুক্তিকে যদি ‘গোয়েন্দাগিরি ও অধিকার খর্বের হাতিয়ার’ হিসেবেই ব্যবহার করা হয়, তাহলে দ্রুতই এ চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে তেহরান।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজে’র সামরিক বিশ্লেষক জেনিফার কাভানাঘ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই অবস্থায় নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক বোমাই সবচেয়ে দ্রুত ও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সব মিলিয়ে এখন প্রশ্ন একটাই ইরান কি শেষ ধাপটা নিতে যাচ্ছে, নাকি আবারও ‘কৌশলগত ধৈর্য’ দেখাবে?

তেহরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো ঘোষণা দেয়নি। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল যদি শেষ পর্যন্ত এই পথেই গড়ায়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্যই এক ভয়াবহ বার্তা হয়ে উঠতে পারে।





Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]